বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের অভিভাবকেরাই দায়ী

Share:
একজন হতাশ শিক্ষার্থী তার বইয়ের সামনে বসে আছে।

আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধারণা চলে আসছে যে, একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক সাফল্যের পেছনে তার অভিভাবকের ভূমিকা অপরিহার্য। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, যত্ন, সঠিক নির্দেশনা এবং প্রেরণা নিঃসন্দেহে তাদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই কথার মধ্যে যথেষ্ট সত্যতা থাকলেও, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, অনেক ক্ষেত্রেই এই অপরিহার্য অবদানই সন্তানের জন্য এক প্রকার চাপ এবং পরিণামে ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

যখন একটি শিশু তার লেখাপড়া শুরু করে, তখন থেকেই আমাদের সমাজের তথাকথিত সচেতন অভিভাবক অর্থাৎ বাবা-মায়েরা তাদের উপর এক প্রকার প্রত্যাশার পাহাড় চাপিয়ে দেন। তারা চান যে, তাদের সন্তান যেন ক্লাসে সর্বদা প্রথম স্থান অধিকার করে, প্রতিটি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ফলাফল করে এবং সবদিক দিয়ে যেন অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকে। মোটামুটি শিশু বয়স থেকেই তাদের কচি মনে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, "তোমাকে জীবনে অনেক বড় হতে হবে! তোমাকে হয় ডাক্তার হতে হবে, নতুবা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, অথবা বিসিএস ক্যাডার হয়ে বড় কোনো সরকারি চাকরি করতে হবে।" এই ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোর মাথায় শৈশব থেকেই এক প্রকার সুপরিকল্পিত চাপ তৈরি করা হয় যে, "তোমাকে সবসময় ফার্স্ট হতে হবে, তোমাকে সবসময় ভালো রেজাল্ট করতে হবে, এবং জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো একটি ভালো চাকরি অর্জন করা।" তাদের নিজস্ব আগ্রহ, মেধা বা স্বপ্নকে এখানে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

এই প্রবল চাপের মুখে কিছু সংখ্যক ছেলেমেয়ে হয়তো তাদের অভিভাবকের প্রত্যাশা পূরণের জন্য বা নিজেদের কঠোর পরিশ্রমে জীবনে সফল হয়ে থাকে, তবে সেই সংখ্যাটা খুবই নগণ্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অধিকাংশ ছেলেমেয়েই তাদের বাবা-মায়ের এই আকাশছোঁয়া আবদার বা মানসিক চাপ (mental pressure) নিতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে পড়ালেখা বা জীবন থেকে ঝরে যায়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, অনেক অভিভাবক তাদের ছেলেমেয়েদের ব্যর্থতাকে কখনো মেনে নিতে পারেন না। তারা কখনোই বিশ্বাস করতে চান না যে, তাদের সন্তান পরীক্ষায় ফেল করতে পারে বা জীবনের কোনো ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তে পারে। অথচ, প্রকৃত সত্য হলো, যে মানুষ জীবনে কখনো ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়নি, সে সফলতার প্রকৃত মূল্য কখনো বুঝতে পারবে না।

আর ব্যর্থতার স্বাদ না পেলে তার পক্ষে সত্যিকারের সফলতা অর্জন করাও অনেক কঠিন। কারণ ব্যর্থতা থেকেই মানুষ তার ভুলগুলো থেকে শেখে, নিজেকে আরও শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ করে তোলে এবং নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা খুঁজে পায়।

আমাদের সমাজের কিছু "সিরিয়াস" অভিভাবক আরও বেশি হতাশ ও নারাজ হয়ে যান যখন তাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড (যেমন—গান, নাচ, অভিনয়), গল্পের বই পড়া বা চিত্র অঙ্কনের মতো বিষয়গুলোতে সময় দেয়। তাদের বদ্ধমূল ধারণা হলো, এসব কর্মকাণ্ড কেবল সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের যুক্তি হচ্ছে, ছেলেমেয়েরা এসব "অহেতুক" কাজ করে কেন তাদের মূল্যবান পড়াশোনার সময় নষ্ট করবে? তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে সবসময় লেখাপড়া করা এবং ভালো নম্বর তোলা।

কিন্তু শুধুমাত্র ভালো ফলাফল করলেই বা পুঁথিগত বিদ্যায় পারদর্শী হলেই যে আপনি জীবনে সফল হতে পারবেন, তার কোনো গ্যারান্টি কোথাও দেওয়া হয় না। বরং আধুনিক বিশ্বে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন বহুমুখী দক্ষতা—যেমন সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং মানসিক দৃঢ়তা। এই দক্ষতাগুলো কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে বা বইয়ের পাতা থেকে অর্জিত হয় না; এগুলোর জন্য প্রয়োজন জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং নিজেদের আগ্রহের ক্ষেত্রগুলোতে স্বাধীনভাবে বিচরণ করার সুযোগ।

অভিভাবকদের এই অহেতুক, অযৌক্তিক এবং অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক ছেলেমেয়ের শৈশব ও কৈশোরকালের সোনালী দিনগুলো নষ্ট হচ্ছে। তারা প্রতিনিয়ত মানসিক ট্রমা ও উদ্বেগে ভুগছে, যার ফলে তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। এত চাপ নিতে না পেরে অনেকেই মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে এবং অনেক সময় আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর পথও বেছে নিচ্ছে। আবার অনেকে পড়ালেখার প্রতি সম্পূর্ণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলে একেবারেই শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে।

এই অতিরিক্ত মানসিক চাপ শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করে এবং তাদের আত্মবিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তারা নিজেদের পছন্দের বিষয় নিয়ে কাজ করতে বা নতুন কিছু চেষ্টা করতে ভয় পায়, কারণ সেখানে যদি ব্যর্থতা আসে, তাহলে অভিভাবকের কটু কথা এবং তিরস্কার শুনতে হবে—এই ভীতি তাদের প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। এর ফলে তারা উদ্ভাবনী ক্ষমতা হারায় এবং জীবনভর অন্যের দেখানো পথে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

তাই আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, অভিভাবকদের তাদের ছেলেমেয়েদের উপর থেকে অযাচিত আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং অপ্রয়োজনীয় চাপ কিঞ্চিত কমানো উচিত। তাদের স্বাধীনতা দেওয়া উচিত যাতে তারা নিজেদের মেধা, আগ্রহ এবং সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী পথ বেছে নিতে পারে। জোর করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য কোনো পেশায় ঠেলে না দিয়ে, তাদের পছন্দের বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে চাওয়া এবং সেগুলোতে তাদের উৎসাহ দেওয়া উচিত। তাদেরকে তাদের মতো করে পড়তে দেওয়া, থাকতে দেওয়া এবং জীবন যাপন করতে দেওয়া উচিত, যাতে তারা নিজেদের ভেতরের সম্ভাবনাগুলোকে চিনতে পারে এবং সেগুলোকে বিকশিত করতে পারে। তাদের সৃজনশীলতা, খেলাধুলা বা যেকোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করা উচিত, কারণ এই বিষয়গুলো তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাহলেই দেখবেন, ওই ছেলে বা মেয়েটি একসময় জীবনে অনেক দূর এগিয়ে যাবে, নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করতে পারবে এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজেদের স্বপ্নের পথে নির্ভয়ে পথ চলতে শিখবে। অন্যথায়, এই অতিরিক্ত চাপের কারণে তারা অচিরেই সমাজ ও জীবনের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ঝরে পড়ে যাবে, যা কেবল তাদের একার জন্য নয়, পুরো জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশু অনন্য এবং তাদের নিজস্ব মেধা ও সম্ভাবনা আছে। অভিভাবকদের মূল কাজ হলো সেই সম্ভাবনাকে চিনতে পারা এবং তাকে বিকশিত হতে সার্বিক সাহায্য করা, কোনো পূর্বনির্ধারিত ছাঁচে ফেলে জোর করে বড় করে তোলা নয়। আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আরও যত্নশীল হই এবং তাদের নিজেদের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেই।

আমার অন্যান্য লেখা পড়তে আগ্রহী?

আমার ব্লগের অন্যান্য পোস্টগুলো পড়ুন অথবা সম্ভাব্য সহযোগিতার জন্য যোগাযোগ করুন।

যোগাযোগ করুন
Raihan Khan

Raihan Khan

AI & Systems Architect, Entrepreneur, e-GP Specialist & Writer

A versatile AI & systems architect and entrepreneur with 10+ years of experience across e-Government systems, software architecture, and project management. Founder of ABCL TECH, Chakri Bangla, Visa Bangla, and e-GP Bangla — alongside writing on technology, society, and personal reflection.