পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষের জন্ম থেকেই তার জীবন যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, আর এই সম্পূর্ণ যুদ্ধে তার প্রথম সহযোদ্ধা হচ্ছে তার মা। মা তার সন্তানকে যুদ্ধ করতে শেখায় এবং এই যুদ্ধে কিভাবে জিততে হবে সেটাও মা ই প্রথম সন্তানকে শিখিয়ে দেয়। মায়ের সেই শেখানো টেকনিক ব্যবহার করে সারা জীবন একটি সন্তান জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে থাকে।
একজন সন্তানের প্রথম যুদ্ধ, তার বেঁচে থাকার যুদ্ধ, তার খাবারের যুদ্ধ। এরপর সে একটু বড় হয়ে গেলে তার উঠে দাঁড়ানোর যুদ্ধ, তার সঠিকভাবে হাঁটতে শেখার যুদ্ধ, কথা বলতে শেখার যুদ্ধ – সবকিছুতেই মায়ের অবদান অনস্বীকার্য। এর কয়েক বছর পরেই শুরু হয় শিক্ষা লাভের যুদ্ধ, মানুষের মত মানুষ হওয়ার যুদ্ধ, নিজেকে মানুষের মত মানুষ করে তুলবার যুদ্ধ – সেখানেও মায়ের অবদান অনস্বীকার্য।
মা দিবস উপলক্ষে আজকের লেখায় আমি তিন থেকে চারটি বিষয় নিয়ে এখানে আলোচনা করেছি।
প্রথমত, প্রত্যেকটা সন্তানের জন্যই তার মা পৃথিবীর সেরা ডাক্তার, এমন নয় যে উনি ডাক্তারি পাস করেছেন এবং অনেক সময় উনার অক্ষরজ্ঞান নাও থাকতে পারে, যেটাকে আমরা তথাকথিত প্রথাগত শিক্ষা বা ডাক্তারি বলি। কিন্তু একটি সন্তান যখন অসুস্থ হয়, তখন আমার মনে হয়, ” মায়েরা যেন কি একটা জাদু জানে, ওই জাদুতেই সন্তান ভালো হয়ে যায়। ছোটবেলায় দেখেছি একটু অসুস্থ হলেই মা দোয়া পড়ে গায়ে ফু দিয়ে দিতো, তাতেই অসুখ ভালো হয়ে যেতো বা তার স্পেশাল রেসিপির কিছু খাবার পরিবেশন করতো, যেগুলো খেলেই সুস্থ হয়ে যেতাম। বড় হয়ে মাকে তেমন একটা কাছে পাই না, বা আগের মতো দেখাও হয় না। সময়-সুযোগ বা ছুটি পেলেই শুধু বাড়িতে যাওয়া হয়, তবে কেন জানি এই বড় বেলায় এসেও আমার কাছে মনে হয়, “শরীর খারাপ হলে বা অসুস্থ হলে, মায়ের সাথে কথা বললেই সুস্থ হয়ে যাই।” মহান আল্লাহর এক অসীম নিয়ামত, যাদের মা জীবিত আছে তারাই জানে মা মানে প্রশান্তি, সবচেয়ে শান্তি লাগে মায়ের সাথে কথা বলতে।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যেকটা সন্তানের জন্যই তার মা পৃথিবীর সেরা শিক্ষক। আপনি আপনার মায়ের কাছে প্রথমেই বলতে শিখেছেন, প্রথমেই আপনি আপনার অভিযোগ-অনুযোগ বা আপনার সমস্ত দাবি মায়ের কাছে তুলে ধরেছেন। আপনার মা ই আপনাকে শিখিয়েছেন কিভাবে কথা বলতে হয়, কিভাবে মানুষের সাথে ভালো আচরণ করতে হয়, কিভাবে বড়দের সম্মান করতে হয়, কিভাবে ছোটদের স্নেহ করতে হয়, কিভাবে মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হয়। শিক্ষা বলতে যদি শুধু আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেই ধরি তাহলে খুব ভুল হবে, শিক্ষার সংজ্ঞা ঠিক আমার কাছে এমন যে, ” কাঙ্ক্ষিত আচরণের পরিবর্তনকে বলে শিক্ষা “, অর্থাৎ আমার কাছে আপনি ততক্ষণ শিক্ষিত বলে গণ্য হবেন না যতক্ষণ আপনার কাঙ্খিত আচরণে, ” আমি সভ্য মানুষের ছোঁয়া দেখতে পাবো না”। আর এই প্রাথমিক শিক্ষাটা আমরা আমাদের মায়ের কাছে পেয়ে থাকি, তাই আমার কাছে আমার মা পৃথিবীর সেরা শিক্ষক।
তৃতীয়ত, প্রত্যেকটা মা একজন উদ্যোক্তা। আমি যেহেতু গ্রামে বড় হয়েছি, আমি আমার পরিবারে এবং আশেপাশে দেখেছি যে – প্রত্যেকটি মা কিছু না কিছু করছেন তার সংসারের জন্য, তার সন্তানদের জন্য। প্রত্যেকেই প্রচন্ড ব্যস্ততার মাঝে দিন পার করেন। কারো হয়তো একটু জায়গা আছে, সেখানে উনি বিভিন্ন ধরনের শাক সবজির চাষ করেন, কিছু হাঁস-মুরগি, গরু ছাগল এগুলো লালন পালন করেন, কারো যদি পুকুর থাকে সেখানে কিছু মাছ চাষ করেন। পরবর্তীতে এগুলো দিয়ে পরিবারের খাদ্যের যোগান মেটান এবং যদি অতিরিক্ত থেকে যায় তাহলে সেটা বিক্রি করে দিয়ে পরিবারে অর্থের সঞ্চার করেন। প্রতিটি মা তার নিজের সন্তানের জন্য তার নিজের পরিবারের জন্য দিনরাত নিরলস ভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, পরিবারের খাদ্যের যোগান দিচ্ছেন এবং সাথে সাথে অর্থের যোগান দিচ্ছেন। সুতরাং আমার কাছে প্রতিটি মা এক এক জন উদ্যোক্তা এবং উনারা পৃথিবীর সেরা উদ্যোক্তা।
প্রত্যেকটা মা তার সন্তানের কাছে তার পরিবারের কাছে একটা ব্যাংক, সেরা কষ্ট জমা রাখার ব্যাংক কিংবা টাকা পাওয়ার ব্যাংক। আপনি যখনই আপনার মায়ের কাছে কোন কিছু চাইবেন, মা কিন্তু কখনোই আপনাকে না করে না। উনি তার সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানকে সর্বোচ্চটাই দেওয়ার চেষ্টা করেন। আমরা মাঝেমধ্যে সন্তানরা হয়তো না বুঝে মায়ের সামর্থের বাইরে অনেক কিছু চেয়ে ফেলি যেটা মায়ের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে হয়তো আপনাকে উনি মাঝে মাঝে না করেন কিন্তু মনে মনে চেষ্টা করেন বা আফসোস করেন যে আমি যদি আমার সন্তানকে এটা দিতে পারতাম এবং পৃথিবীর সমস্ত মা এই চেষ্টাটাই করেন তার সন্তান যেন সবসময় সুখে থাকে শান্তিতে থাকে।
পরিশেষে বলতে চাই, মা হল পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক, যেখানে আমরা আমাদের সব দুঃখ কষ্ট জমা রাখি এবং বিনিময় নেই বিনা সুদে অকৃত্রিম ভালোবাসা! আমাদেরকে এই সুন্দর পৃথিবীর মুখ দেখানো থেকে শুরু! তারপর জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে তাঁর অবদান, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক! নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে সারা জীবন আমাদের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, ভালোবাসা দিয়ে যান! আপনি শত অপরাধ করলেও যিনি মাফ করে দেন। আপনাকে পৃথিবীতে সবথেকে বেশি ভালোবাসেন যিনি, তিনি হচ্ছেন আপনার মা!
আজ বিশ্ব মা দিবসে আমার নামটি লিখে দিলাম তোমার চরণ তলে!
পৃথিবীর সকল মায়েদের জানাই বিশ্ব মা দিবসের শুভেচ্ছা!
Share your love for your mother!
Leave a comment below and share this post with your friends and family.
Contact Me