বাবা: নির্ভরতার ছায়া থেকে বন্ধুত্বের আলো

Share:
Baba

জীবনের পথচলায় আমরা বহু মানুষের সান্নিধ্যে আসি, গড়ে ওঠে অগণিত সম্পর্ক। কিন্তু কিছু সম্পর্ক থাকে রক্তের অক্ষরে লেখা, যার গভীরতা মাপা যায় না, যার তুলনা হয় না। বাবা, এই ছোট্ট একটি শব্দ আমাদের জীবনে তেমনই এক সম্পর্কের নাম—এক বিশাল বটবৃক্ষের ছায়া, নির্ভরতার এক অটল পর্বত। আজ, জীবনের অনেকগুলো বসন্ত পেরিয়ে এসে যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন বাবা নামক এই সম্পর্কের নানা স্তর ও রূপান্তর চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে ছেলেদের সঙ্গে বাবার সম্পর্কটা যেন এক চিরাচরিত সমীকরণ মেনে চলে। আমার ক্ষেত্রেও তার বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেনি। শৈশবে বাবা মানে ছিলেন এক দূরত্ব, খানিকটা ভয় আর শ্রদ্ধার এক মিশ্র অনুভূতি। সংসারের ভরণপোষণ আর শত ব্যস্ততার মাঝে বাবার কঠোর অবয়বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্নেহটুকু বোঝার মতো পরিণত মন তখন ছিল না। তাই যত আবদার, যত নালিশ, তার সবই ছিল মায়ের কাছে। বাবা ছিলেন পরিবারের চালিকাশক্তি, যাঁর কাছে সরাসরি কিছু চাওয়ার সাহস কমই হতো। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, মায়ের মাধ্যমে বা অন্য কোনো উপায়ে সেই চাওয়াগুলো ঠিকই বাবার কানে পৌঁছাত এবং কোনো এক জাদুকরী উপায়ে তা পূরণও হয়ে যেত। বাবা কখনো কোনো আবদার অপূর্ণ রাখেননি। তাঁর শাসন ছিল নীরব, চাহনি ছিল অর্থবহ। তিনি খুব বেশি বকাঝকা না করলেও তাঁর একটিমাত্র উপদেশ সারাজীবন কানে বেজেছে—"মানুষের মতো মানুষ হয়ো।" এই উপদেশের ভার যে কতটা গভীর, তা হয়তো তিনি আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবেন, কারণ তাঁর দেওয়া সেই নৈতিকতার মানদণ্ডে আমি কতটুকু উত্তীর্ণ হতে পেরেছি, তা তিনিই ভালো জানেন।

সময়ের স্রোতে কৈশোর পেরিয়ে যখন উচ্চশিক্ষার জন্য পরিবার ছেড়ে ঢাকার মতো এক যান্ত্রিক শহরে পা রাখলাম, তখন থেকেই বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। শারীরিক দূরত্ব যেন মানসিক দূরত্বকে কমিয়ে আনল বিস্ময়করভাবে। নিয়মিত ফোনালাপে বাবা আর শুধু আমার আশ্রয়দাতা বা অভিভাবক হয়ে রইলেন না, হয়ে উঠলেন আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আমাদের আলাপের বিষয়বস্তু তখন আর শুধু পড়াশোনা বা খরচের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না; তা বিস্তৃত হলো সমাজব্যব ব্যবস্থা, সাহিত্য, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি পর্যন্ত। আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম আমার বাবাকে—একজন চিন্তাশীল, প্রজ্ঞাবান ও আধুনিক মনস্ক মানুষ হিসেবে। তাঁর অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও জীবনদর্শন আমাকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করতে লাগল। শৈশবের সেই দূরত্বের দেয়াল ভেঙে আমরা হয়ে উঠলাম দুই বন্ধু, যারা একে অপরের সাথে নির্দ্বিধায় জগতের সবকিছু নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

এরপর এলো জীবনের সবচেয়ে কঠিন পর্যায়—কর্মজীবন। নিজের কাঁধে দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি প্রথম উপলব্ধি করতে পারলাম, আমার ছোট ছোট আবদার আর স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে আমার বাবাকে কী অপরিসীম কষ্ট আর ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তাঁর বেতনের টাকায় মাস শেষের টানাপোড়েন, সন্তানের उज्ज्वल ভবিষ্যতের জন্য নিজের শখ-আহ্লাদকে বিসর্জন দেওয়া, আর মুখে হাসি বজায় রেখে সব চাপ সামলে নেওয়ার সেই কঠিন লড়াইটা আজ আমি অনুধাবন করতে পারি। আজ বুঝতে পারি, আমার নতুন জামাটা কেনার পেছনে হয়তো লুকিয়ে ছিল তাঁর কোনো পুরনো শার্ট দিয়ে আরও একটা বছর চালিয়ে নেওয়ার গল্প। আমার ভালো থাকা নিশ্চিত করার জন্য তিনি নিজের কত বিনিদ্র রাত আর নির্লিপ্ত দিনের মধ্য দিয়ে গেছেন, তা ভেবে আজও কৃতজ্ঞতায় মন নত হয়ে আসে।

আসলে, এই গল্পটা শুধু আমার একার নয়। পৃথিবীর সকল বাবার নিঃস্বার্থ ত্যাগের গল্পটাই প্রায় এক। সন্তানের জন্য তাঁরা নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দেন এক অনাবিল প্রশান্তিতে। তাঁরা চান না কোনো প্রতিদান, চান শুধু সন্তানের সাফল্য আর মঙ্গল।

আজ বিশ্ব বাবা দিবসে শুধু আনুষ্ঠানিকতার জন্য নয়, হৃদয়ের গভীর থেকে আমার বাবার প্রতি এবং পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। বাবা, তুমি কেবল একজন ব্যক্তি নও, তুমি একটি অনুভূতির নাম, একটি আদর্শের নাম। তোমার ছায়া আর তোমার বন্ধুত্বের আলোতেই আমার পথচলা। তোমার শেখানো "মানুষের মতো মানুষ" হওয়ার সেই মন্ত্র আমি আজীবন বয়ে বেড়াব।

Interested in my thoughts?

Read more of my blog posts or get in touch to discuss potential collaborations.

Contact Me
Raihan Khan

Raihan Khan

AI & Systems Architect, Entrepreneur, e-GP Specialist & Writer

A versatile AI & systems architect and entrepreneur with 10+ years of experience across e-Government systems, software architecture, and project management. Founder of ABCL TECH, Chakri Bangla, Visa Bangla, and e-GP Bangla — alongside writing on technology, society, and personal reflection.