বাংলাদেশের অধিকাংশ কোম্পানি কেন ফেল করে? অভিজ্ঞতার অবমূল্যায়ন ও কর্পোরেট ব্যর্থতার বিশ্লেষণ

Share:
বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ—ছোট কোম্পানি ভেঙে পড়ছে, বড় কোম্পানি বড় হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রায় কয়েক লক্ষ ছোট এবং মাঝারি ধরনের কোম্পানি আছে। এসব কোম্পানি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলে বিবেচিত হলেও, একটি নির্মম বাস্তবতা হলো—এগুলোর অধিকাংশই একটা সময়ের পরে এসে আর সাসটেইন করতে পারে না। বছরের পর বছর ধরে যে স্বপ্ন এবং পরিশ্রম দিয়ে এসব উদ্যোগ গড়ে তোলা হয়, শেষ পর্যন্ত সেগুলো মার্কেটে টিকে থাকতে পারে না। অন্যদিকে, বড় কোম্পানিগুলো শুধুই বড় হচ্ছে, তাদের সাম্রাজ্য ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। কেন এই বৈষম্য? কেন ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলো বড় কোম্পানি হয়ে উঠতে পারছে না? সেটা নিয়েই আজকে আমার এই বিশ্লেষণধর্মী লেখাটি।

দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে একটি পর্যবেক্ষণ

দীর্ঘ এক যুগ ধরে আমি বাংলাদেশের কর্পোরেট কোম্পানিতে চাকরি করছি। এই চাকরির সুবাদে বেশ কিছু অভিজ্ঞতার সঞ্চার হয়েছে—ভালো-মন্দ, সফলতা-ব্যর্থতা, উত্থান-পতন, সবকিছুই কাছ থেকে দেখেছি। এর মধ্যে আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করে দেখলাম যে ছোট এবং মাঝারি ধরনের কোম্পানিগুলো সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে। তারা দীর্ঘ মেয়াদে মার্কেটে থাকতে পারছে না। আর বড় কোম্পানিগুলো শুধুই বড় হচ্ছে—তাদের বাজার দখল বাড়ছে, তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ছে, তাদের মুনাফা বাড়ছে।

এটা কি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি? নাকি তাদের কলাকৌশল? নাকি তাদের মার্কেটে টিকে থাকা এবং বড় হওয়ার তীব্র ইচ্ছা? নাকি যোগ্য লোককে যোগ্য স্থানে বসানো এবং পুরাতন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাদের যোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা? আমার মনে হয় শেষের কারণটি এই কোম্পানিগুলোর বড় হয়ে ওঠার সবথেকে বড় কারণ।

"কম টাকায় ভালো জিনিস" মানসিকতা: সবচেয়ে বড় ভুল

আমার দীর্ঘ এক যুগের অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখলাম বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো সব সময় চায় কম টাকায় ভালো প্রোডাক্ট বা ভালো মানের কাজ। এবং সেটা শুধু প্রোডাক্টের ক্ষেত্রেই নয়—যারা সেই প্রোডাক্ট তৈরি করে, সেই কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই মানসিকতা কাজ করে। অর্থাৎ, কম বেতনে সর্বোচ্চ মানের কর্মী নিয়োগ দিতে চান মালিকেরা। এই "শস্তায় সেরা" মানসিকতাই হলো বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ।

ধরুন, বাংলাদেশের একটি কোম্পানি যখন শুরু হয়, তখন তার শুরুর দিককার যে কর্মকর্তারা থাকেন, তারা আস্তে আস্তে একসময় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে থাকেন। যদিও বয়সের সাথে সাথে তাদের শারীরিক কর্মক্ষমতা হয়তো কিছুটা কমে যায়, কিন্তু তাদের যে বুদ্ধিভিত্তিক সক্ষমতা, কৌশলগত চিন্তাভাবনা, সংকট মোকাবেলার দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি (Institutional Memory)—সেগুলো কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই অভিজ্ঞতার মূল্য কোনো টাকা দিয়ে কেনা যায় না।

অভিজ্ঞ বনাম অনভিজ্ঞ: একটি মৌলিক পার্থক্য

তবে আমাদের দেশে কেন জানি একটা প্র্যাকটিসের মতো দাঁড়িয়ে গেছে—কম টাকায় ভালো মানের কর্মকর্তা পাওয়ার চেষ্টা। শুরুতে যখন একজন কর্মী কোম্পানিতে যোগদান করেন, তার অনেক অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকে। হয়তো দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সে অনেক কিছু শিখে ফেলে। কিন্তু দুই থেকে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞ একজন লোকের চেয়ে ১০-১২ বা ২০ বছরের একজন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকের অভিজ্ঞতা অবশ্যই অনেক বেশি। এই পার্থক্যটা কোম্পানির মালিকেরা বুঝতে চান না, অথবা বুঝলেও স্বীকার করতে চান না।

একটি উদাহরণ দিই। ধরুন, একজন ইঞ্জিনিয়ার ৩ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি কোম্পানিতে কাজ করছেন। তিনি হয়তো চমৎকারভাবে কোড লিখতে পারেন, প্রজেক্ট ডেলিভার করতে পারেন। কিন্তু যখন একটি সিস্টেম প্রোডাকশনে বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে, যখন ক্লায়েন্টের সাথে জটিল আলোচনায় যেতে হয়, যখন দীর্ঘমেয়াদী আর্কিটেকচারাল সিদ্ধান্ত নিতে হয়—তখন ১৫-২০ বছরের একজন অভিজ্ঞ প্রফেশনালের বিকল্প নেই। কারণ তিনি এই ধরনের পরিস্থিতি আগেও দেখেছেন, সামলেছেন এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েছেন।

১০০ টাকার জিনিস ৫০০ টাকায় কেন কিনব?—এই ভুল বোঝাবুঝিই সর্বনাশ

আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে যে পরিমাণ সম্মান বা সম্মানী দেওয়া উচিত, সেটা আমাদের দেশীয় কোম্পানিগুলো দিতে রাজি নন। তাদের যুক্তি হচ্ছে—"আমি তো ১০০ টাকায় এই জিনিসটি পাচ্ছি, তাহলে আমি ওই একই জিনিসটি কিনতে কেন ৫০০ টাকা খরচ করব?"

এখানেই মূলত সবচেয়ে বড় ঘাটতি। কারণ ১০০ টাকার জিনিস আর ৫০০ টাকার জিনিস কখনোই এক নয়। বাইরে থেকে দেখতে একই রকম মনে হলেও, গুণগত মান, টেকসইতা, গভীরতা এবং দূরদর্শিতায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকে। একজন অনভিজ্ঞ কর্মী হয়তো আজকের কাজটি করে দিতে পারবে, কিন্তু আগামীকালের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সে প্রস্তুত নয়। একজন অভিজ্ঞ কর্মী শুধু আজকের কাজই করেন না, তিনি আগামীকালের সম্ভাব্য সমস্যাগুলোও আগে থেকেই আন্দাজ করতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে পারেন।

অভিজ্ঞ কর্মীদের অসম্মান: একটি নৈতিক প্রশ্ন

আপনি কখনোই একজন অর্বাচীনের সাথে একজন অভিজ্ঞ লোকের তুলনা করতে পারবেন না। এটা আসলেই ওই অভিজ্ঞ লোকটিকে অসম্মান করা হয়। যে লোকটি আপনার জন্য তার জীবনের মূল্যবান ২০ বছর সময় ব্যয় করলো, আপনার কোম্পানিকে শূন্য থেকে দাঁড় করাতে সাহায্য করলো, সে অবশ্যই আপনার কাছ থেকে অনেক কিছুই আশা করে এবং তার সেই সম্মানটা প্রাপ্য।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক কোম্পানি মালিক এই অভিজ্ঞ কর্মীটিকে "খরচ" হিসেবে দেখেন, "সম্পদ" হিসেবে নয়। তারা ভাবেন, "এত বেতন দিয়ে একজনকে রাখার চেয়ে অর্ধেক বেতনে দুজনকে রাখা ভালো।" এই হিসাবটা পেন্সিলে করলে সঠিক মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে এটি কোম্পানির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

কী হয় যখন অভিজ্ঞরা চলে যান?

  • প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান হারিয়ে যায়: একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা শুধু তার কাজের দক্ষতাই নন, তিনি কোম্পানির ইতিহাস, ক্লায়েন্টদের সাথে সম্পর্ক, পুরনো সমস্যার সমাধান, এবং অলিখিত নিয়ম-কানুন—সবকিছুর ভাণ্ডার। তিনি চলে গেলে এই সবকিছুই হারিয়ে যায়।
  • টিম মোরাল ভেঙে পড়ে: যখন জুনিয়ররা দেখেন যে ১৫-২০ বছর কাজ করেও কোম্পানি থেকে সম্মান পাওয়া যায় না, তখন তারাও নিরাশ হয়ে পড়েন। তারা ভাবেন, "আমারও তো একই পরিণতি হবে।" ফলে তারাও দ্রুত চলে যেতে চান।
  • ক্লায়েন্ট সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়: অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা প্রায়ই ক্লায়েন্টদের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করেন। তারা চলে গেলে ক্লায়েন্টরা অসন্তুষ্ট হন এবং অনেক সময় প্রতিযোগী কোম্পানিতে চলে যান।
  • ভুল সিদ্ধান্তের হার বাড়ে: অনভিজ্ঞ কর্মীরা স্বাভাবিকভাবেই বেশি ভুল করেন। এই ভুলগুলো কোম্পানির জন্য আর্থিক ক্ষতি, সময় ক্ষতি এবং সুনামের ক্ষতি বয়ে আনে।

বিশ্বমানের কোম্পানিগুলো কী করে ভিন্নভাবে?

পৃথিবীর সফল কোম্পানিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করে। গুগল, মাইক্রোসফট, টয়োটা, স্যামসাং—এই কোম্পানিগুলো তাদের সিনিয়র কর্মকর্তাদের শুধু ভালো বেতনই দেয় না, তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করে। তারা "মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম" চালু করে যেখানে অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা নবীনদের গাইড করেন। এতে দুই পক্ষই লাভবান হয়—অভিজ্ঞরা সম্মান পান আর নবীনরা দ্রুত শেখেন।

জাপানের কর্পোরেট সংস্কৃতিতে "সেনপাই-কোহাই" ব্যবস্থা আছে, যেখানে সিনিয়রদের সম্মান করা বাধ্যতামূলক এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে কোম্পানির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কারণেই জাপানি কোম্পানিগুলো শত বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পৃথিবীতে ১০০ বছরের বেশি পুরনো কোম্পানিগুলোর মধ্যে অধিকাংশই জাপানি।

বাংলাদেশের কর্পোরেট সংস্কৃতির আরও কিছু সমস্যা

১. পারিবারিক ব্যবসায় পেশাদারিত্বের অভাব

বাংলাদেশের অনেক কোম্পানি পারিবারিকভাবে পরিচালিত হয়। মালিকের ছেলে বা ভাই—যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক—গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে যান। ফলে যোগ্য পেশাদার কর্মকর্তারা হতাশ হয়ে চলে যান। এটি কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে।

২. স্বল্পমেয়াদী চিন্তাভাবনা

আমাদের দেশের বেশিরভাগ কোম্পানি মালিক শুধু এই মাসের বা এই বছরের লাভ নিয়ে চিন্তা করেন। তারা ৫ বছর বা ১০ বছর পরের কথা ভাবেন না। অথচ, একটি কোম্পানিকে বড় করতে হলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অপরিহার্য। কর্মীদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রযুক্তি আপগ্রেড—এসবে বিনিয়োগ না করলে কোম্পানি কখনোই বড় হতে পারে না।

৩. কর্মীদের প্রতি অবিশ্বাস

অনেক মালিক মনে করেন, কর্মীরা সব সময় তাদের ঠকাচ্ছে বা কম কাজ করছে। এই অবিশ্বাসের কারণে তারা কর্মীদের উপর অতিরিক্ত নজরদারি করেন, তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেন। ফলে কর্মীরা সৃজনশীলভাবে কাজ করতে পারেন না এবং কোম্পানির প্রতি তাদের আনুগত্য কমে যায়।

৪. "রিপ্লেসেবল" মানসিকতা

অনেক মালিকের মুখে শুনেছি—"কাউকে দরকার নেই, যেকেউ চলে যেতে পারে, আমি আবার নতুন লোক নিয়ে আসব।" এই মানসিকতা কোম্পানির জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। কারণ প্রতিটি কর্মী চলে গেলে তার প্রতিস্থাপনে যে সময়, অর্থ এবং প্রশিক্ষণ খরচ হয়, তা হিসাব করলে দেখা যাবে পুরনো কর্মীকে ভালো বেতন দিয়ে রাখাটাই বেশি সাশ্রয়ী ছিল।

সংখ্যায় দেখা যাক: কর্মী ধরে রাখার খরচ বনাম প্রতিস্থাপনের খরচ

আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, একজন কর্মীকে প্রতিস্থাপন করতে তার বার্ষিক বেতনের ৫০% থেকে ২০০% পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এই খরচের মধ্যে রয়েছে:

  • নিয়োগ প্রক্রিয়ার খরচ: বিজ্ঞাপন, সাক্ষাৎকার, স্ক্রিনিং ইত্যাদি।
  • প্রশিক্ষণ খরচ: নতুন কর্মীকে কোম্পানির কাজের ধরন শেখাতে কমপক্ষে ৩-৬ মাস সময় লাগে।
  • উৎপাদনশীলতার ক্ষতি: নতুন কর্মী পুরোদমে কাজ শুরু করতে ৬ মাস থেকে ১ বছর সময় নেন।
  • অন্যান্য কর্মীদের উপর অতিরিক্ত চাপ: পুরনো কর্মী চলে গেলে তার কাজের বোঝা অন্যদের উপর পড়ে, যা তাদের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

তাহলে একজন অভিজ্ঞ কর্মীকে মাসে অতিরিক্ত ১০-২০ হাজার টাকা বেতন দিলে যে খরচ বাড়ত, তার চেয়ে অনেক বেশি খরচ হচ্ছে তাকে হারানোর কারণে। কিন্তু এই সহজ গণিতটা আমাদের অনেক কোম্পানি মালিক বুঝতে চান না।

কিছু বাস্তব উদাহরণ

আমি আমার কর্পোরেট জীবনে এমন অনেক ঘটনা দেখেছি যেখানে একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে সামান্য বেতন বৃদ্ধি না দেওয়ায় তিনি কোম্পানি ছেড়ে দিয়েছেন। তার জায়গায় কম বেতনে একজন নবীন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম কয়েক মাস মনে হয়েছে কোম্পানি বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত নিয়েছে—খরচ বাঁচছে। কিন্তু ৬ মাসের মধ্যেই দেখা গেছে, সেই নবীন কর্মী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টে এমন ভুল করেছে যার ক্ষতি পূরণ করতে কোম্পানির লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে।

আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি, অভিজ্ঞ কর্মকর্তা চলে গিয়ে প্রতিযোগী কোম্পানিতে যোগ দিয়েছেন এবং সেখান থেকে পুরনো কোম্পানির ক্লায়েন্ট নিয়ে গেছেন। এটি শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি কোম্পানির অস্তিত্বের জন্যও হুমকি।

সমাধানের পথ: কী করলে কোম্পানিগুলো বড় হতে পারবে?

বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোকে যদি সত্যিই বড় হতে হয়, তাহলে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে:

  • অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন: কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অনুযায়ী তাদের বেতন এবং সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করতে হবে। "কম টাকায় বেশি কাজ" মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
  • দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা: শুধু এই মাসের লাভ নয়, ৫-১০ বছরের পরিকল্পনা করতে হবে। কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে।
  • পেশাদার ব্যবস্থাপনা: পারিবারিক ব্যবসায়েও পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য পদে বসাতে হবে, আত্মীয়তার ভিত্তিতে নয়।
  • কর্মী ধরে রাখার কৌশল: শুধু বেতন নয়, কর্মপরিবেশ, সম্মান, ক্যারিয়ার গ্রোথ, এবং কাজ-জীবনের ভারসাম্য—এসব দিকেও নজর দিতে হবে।
  • জ্ঞান হস্তান্তর ব্যবস্থা: অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের জ্ঞান যেন কোম্পানিতে থেকে যায়, সেজন্য ডকুমেন্টেশন, মেন্টরশিপ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করতে হবে।
  • বিশ্বাস ও স্বচ্ছতা: কর্মীদের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে। স্বচ্ছ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

দিনশেষে কথা একটাই—বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো যে ব্যর্থ হচ্ছে, এর প্রধান কারণ তার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রাপ্য সম্মান না দেওয়া। কোম্পানিগুলো বর্তমানে অনভিজ্ঞ, কম বেতনের কর্মী দিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষণিকের জন্য হয়তো দেখা যাচ্ছে যে কোম্পানি লাভবান হতে পারছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে এই কোম্পানিগুলো আর সামনের দিকে আগাতে পারছে না।

একটি কোম্পানি তার প্রোডাক্ট দিয়ে নয়, তার মানুষ দিয়ে বড় হয়। আর মানুষকে ধরে রাখতে হলে তাদের অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করতে হবে, তাদের সম্মান দিতে হবে এবং তাদের সাথে ন্যায্য আচরণ করতে হবে। যে কোম্পানি এটা বুঝবে, সেই কোম্পানিই বাংলাদেশের পরবর্তী বড় কোম্পানি হয়ে উঠবে। আর যে বুঝবে না, সে হারিয়ে যাবে সময়ের স্রোতে—যেমন হারিয়ে গেছে তার আগে অসংখ্য কোম্পানি।

আমার অন্যান্য লেখা পড়তে আগ্রহী?

কর্পোরেট জগৎ, প্রযুক্তি ও সমাজ নিয়ে আমার আরও বিশ্লেষণধর্মী লেখা পড়ুন।

সকল ব্লগ পড়ুন
Raihan Khan

Raihan Khan

AI & Systems Architect, Entrepreneur, e-GP Specialist & Writer

A versatile AI & systems architect and entrepreneur with 10+ years of experience across e-Government systems, software architecture, and project management. Founder of ABCL TECH, Chakri Bangla, Visa Bangla, and e-GP Bangla — alongside writing on technology, society, and personal reflection.