বাংলাদেশে "শিক্ষকতা" শব্দটি উচ্চারণ করলেই চোখে ভেসে ওঠে সম্মান ও শ্রদ্ধার এক প্রতিচ্ছবি। শিক্ষকদের মানুষ গড়ার কারিগর এবং সভ্যতার ধারক-বাহক হিসেবে গণ্য করা হয়। সমাজ আশা করে, তাঁরা হবেন ন্যায় ও নীতির প্রতীক, জ্ঞানচর্চার দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই মহান পেশার পেছনের বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। অপর্যাপ্ত বেতন কাঠামো এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে দেশের শিক্ষকদের এক বড় অংশ আজ অর্থনৈতিকভাবে নিষ্পেষিত, যা তাদের বাধ্য করছে শ্রেণিকক্ষের বাইরে অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজতে।
অবহেলিত এক মহান পেশা:
দেশ গড়ার এই কারিগররা অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেণিগুলোর মধ্যে অন্যতম। একজন শিক্ষকের প্রাথমিক বেতন অতি অল্প টাকা। এর সাথে যুক্ত হয় নামমাত্র বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা। সব কর্তন শেষে যা হাতে থাকে, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে একটি পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব। জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয়ের এ যুগে এই স্বল্প আয় শিক্ষকদের এক মানবেতর জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন কাঠামো অত্যন্ত আকর্ষণীয়, যা মেধাবীদের এই পেশায় আসতে উৎসাহিত করে।
বাস্তবতার নির্মম কষাঘাত:
শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়, এটি একটি মহান ব্রত। একজন শিক্ষক সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি। তাই আর্থিক অসচ্ছলতা থাকলেও তারা শ্রমিকের মতো দিনমজুরি করতে পারেন না, পারেন না রিকশার প্যাডেলে পা রাখতে। সমাজের চোখে তাদের যে সম্মান, তা তাদের ভিন্ন কোনো কায়িক শ্রমে যুক্ত হতে বাধা দেয়। ফলে, একটি সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য এবং পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে তাদের বেছে নিতে হয় অতিরিক্ত খাটুনির পথ—টিউশনি বা কোচিং সেন্টারে পাঠদান।
টিউশনি ও কোচিং: প্রয়োজন নাকি বিলাসিতা?
ইদানিং শিক্ষকদের টিউশনি বা কোচিং সেন্টারে পড়ানো নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, শিক্ষকরা ক্লাসরুমে না পড়িয়ে কোচিংয়ে পড়াতে বেশি আগ্রহী। এই অভিযোগের কিছুটা সত্যতা থাকলেও এর পেছনের মূল কারণটি আমরা এড়িয়ে যাই। যে শিক্ষককে তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য সার্বক্ষণিক চিন্তা করতে হয়, তার পক্ষে শ্রেণিকক্ষে শতভাগ মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আর্থিক সচ্ছলতার অভাবই অধিকাংশ শিক্ষককে প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য করে। এটি তাদের পছন্দ নয়, বরং প্রয়োজন।
ব্যর্থতার দায় কার?
এই পরিস্থিতির জন্য শিক্ষকদের দায়ী করা মূলত সমস্যার মূল থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার সামিল। এর প্রকৃত দায় আমাদের সমাজের, আমাদের রাষ্ট্রের। আমরা আমাদের শিক্ষকদের যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারিনি, তাদের জন্য সম্মানজনক জীবনযাপনের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়েছি। বেতনের জন্য বা নিজেদের মর্যাদা আদায়ের জন্য শিক্ষকদের যখন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হয়, তখন তা সমগ্র জাতির জন্য লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাষ্ট্রের অবহেলা এখানে স্পষ্ট। জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। শিক্ষকদের বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির দাবি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত। সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবির প্রতি কর্ণপাত না করে অনেক সময় দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
শিক্ষিত জাতির কারিগরদের মূল্যায়ন:
একটি শিক্ষিত ও উন্নত জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিহার্য। যে জাতি তার শিক্ষকদের সম্মান করতে জানে না, সে জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না। তাই শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা, যোগ্য ও মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা এবং তাদের জন্য সম্মানজনক বেতন কাঠামো নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব।
দিনশেষে, একজন শিক্ষক যখন তার প্রাপ্য সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হন, তখন তার প্রভাব পড়ে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। তাই শিক্ষকদের কোচিং বা টিউশনিকে কেবল একটি বাণিজ্যিক কার্যকলাপ হিসেবে না দেখে, এর পেছনের আর্থ-সামাজিক কারণগুলো অনুধাবন করা জরুরি। শিক্ষকদের কাঁধে দোষ চাপিয়ে দায়মুক্তি না নিয়ে, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সচ্ছলতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কারণ, একজন সন্তুষ্ট এবং চিন্তামুক্ত শিক্ষকই পারেন একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে, যা একটি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার পূর্বশর্ত।
