বিষবৃক্ষের গল্প
একটি সমৃদ্ধ বাগানের কথা কল্পনা করুন। সেই বাগানে একটি বৃক্ষ জন্মেছিল, যার নাম ছিল "সরকারি সেবা"। এই বৃক্ষের কাজ ছিল সমস্ত বাগানবাসীকে ছায়া দেওয়া, ফল দেওয়া, এবং তাদের জীবনকে সুন্দর করা।
কিন্তু এই বৃক্ষের শেকড়গুলো—যাকে আমরা "পরিবার" বলতে পারি—ধীরে ধীরে বিষাক্ত হয়ে উঠল। শেকড়গুলো মাটি থেকে শুধু নিজের জন্য রস টানতে শুরু করল, বাগানের অন্য গাছদের কথা না ভেবে। এই রূপকের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে পারিবারিক জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি বাংলাদেশে দুর্নীতির এক গভীর প্রোথিত কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নদীর স্রোত যেভাবে দূষিত হয়
ক) উৎসমুখে বিষ
একটি পরিবারকে ভাবুন একটি ছোট ঝরনা হিসেবে। সেই ঝরনা থেকে জল নামে, যা পরে বড় নদীতে মেশে। যদি ঝরনার উৎসেই বিষ মেশানো হয়, তাহলে পুরো নদী দূষিত হয়ে যায়। বাংলাদেশের বহু পরিবারে একটি অলিখিত নিয়ম চালু আছে: "পরিবারের সদস্য যা-ই করুক, আমরা তাকে সমর্থন করব।"
এক গ্রামে একজন স্কুলশিক্ষক ছিলেন। তিনি বছরের পর বছর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করতেন এবং অর্থের বিনিময়ে ছাত্রদের কাছে বিক্রি করতেন। তাঁর স্ত্রী জানতেন, ছেলেমেয়েরা জানত, এমনকি বৃদ্ধ মা-বাবাও জানতেন। কিন্তু কেউ কিছু বলেননি। বরং সেই অর্থে পরিবারের সবাই নতুন জামাকাপড় কিনেছেন, ঈদে ভালো খেয়েছেন। পরিবারের নীরবতা সেই শিক্ষককে আরও সাহসী করেছে।
একজন সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার। তিনি বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়ার বদলে রোগীদের নিজের প্রাইভেট ফার্মেসিতে পাঠাতেন। তাঁর পরিবারের সবাই জানত এই টাকা কোথা থেকে আসছে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী কখনো জিজ্ঞেস করেননি, "তুমি কি ঠিক কাজ করছ?" বরং বলেছেন, "সবাই করে, তুমি না করলে বোকা।"
খ) "সবাই করে" - মহামারীর সূত্রপাত
এই তিন শব্দ—"সবাই করে"—যেন একটি ভাইরাস। এই ভাইরাস পরিবার থেকে পরিবারে ছড়িয়ে পড়েছে।
একজন তরুণ প্রথম চাকরি পেলেন একটি সরকারি অফিসে। প্রথম মাসেই তিনি দেখলেন, ফাইল এগিয়ে দেওয়ার জন্য "চা-পানির" ব্যবস্থা করতে হয়। তিনি বাড়িতে এসে বাবাকে জানালেন। বাবা বললেন, "বাবা, এটা তো সব জায়গাতেই হয়। তুমি না নিলে অন্য কেউ নেবে। আমাদের সংসার চালাতে হবে তো!" সেই তরুণ, যিনি হয়তো সৎ থাকতে চেয়েছিলেন, পরিবারের এই "অনুমোদন" পেয়ে ধীরে ধীরে দুর্নীতির চক্রে প্রবেশ করলেন।
দালানের ভিত্তি যখন বালি
ক) উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিকৃতি
বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে সন্তানের প্রতি এক অদ্ভুত প্রত্যাশা কাজ করে: "তুমি বড় হয়ে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে।" কিন্তু এই "মুখ উজ্জ্বল করা" বলতে প্রায়ই বোঝানো হয় বড় বাড়ি, গাড়ি, সামাজিক প্রতিপত্তি।
এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে সরকারি চাকরি পেলেন। বেতন সামান্য। কিন্তু পাঁচ বছরের মধ্যে তিনি রাজধানীতে ফ্ল্যাট কিনলেন, গাঁয়ে পাকা বাড়ি করলেন, ভাইয়ের বিয়েতে লাখ টাকার গহনা দিলেন। পরিবারের কেউ জিজ্ঞেস করেননি, "এত টাকা কোথা থেকে এল?" বরং আত্মীয়রা তাঁকে আদর্শ হিসেবে দেখাতে লাগলেন অন্য ছেলেদের।
খ) বিয়ের বাজার ও দুর্নীতির সম্পর্ক
আরেকটি গভীর সমস্যা লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক রীতিতে। পাত্র দেখতে এসেছেন মেয়ের বাবা-মা। প্রথম প্রশ্ন: "ছেলে কোথায় চাকরি করে?" উত্তর: "সরকারি অফিসে।" দ্বিতীয় প্রশ্ন (মনে মনে): "কোন পদে? 'আয়ের' সুযোগ কেমন?" এই "আয়ের সুযোগ" শব্দবন্ধটি আসলে দুর্নীতির আরেক নাম। একজন সৎ কর্মকর্তার চেয়ে একজন "ঘুষখোর" কর্মকর্তা বিয়ের বাজারে বেশি কদর পান!
মাকড়সার জাল
ক) স্বজনপ্রীতির চক্র
কল্পনা করুন একটি মাকড়সার জালের কথা। কেন্দ্রে বসে আছেন একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি। জালের প্রতিটি সুতো তাঁর পরিবারের সদস্যদের সাথে যুক্ত।
একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একটি বিভাগের প্রধান হলেন। ছয় মাসের মধ্যে তাঁর ভাগ্নে হলেন সেই বিভাগের ঠিকাদার, তাঁর শ্যালক পেলেন সাপ্লাইয়ের কাজ, তাঁর স্ত্রীর নামে খোলা হলো কনসালটেন্সি ফার্ম এবং তাঁর ছেলে পেয়ে গেলেন একটি ভালো পদ। এই পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবারের কেউ বলেননি, "এটা কি ঠিক হচ্ছে?"
নীরব সম্মতির বিষ
এক স্বামী প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে পকেট থেকে টাকা বের করতেন। সেই টাকা কোথা থেকে আসে, স্ত্রী জানতেন। কিন্তু তিনি কখনো প্রশ্ন করেননি। ছোট্ট একটি মেয়ে একদিন জিজ্ঞেস করল, "বাবা, তোমার অফিসে যারা আসে তারা তোমাকে টাকা দেয় কেন?" বাবা বললেন, "ওটা উপহার, মা।" মেয়ে শিখল: অন্যের কাছ থেকে সুবিধার বদলে "উপহার" নেওয়া স্বাভাবিক।
পচনের গভীরতা
শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামো—সবখানেই এই পারিবারিক নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। যখন কোনো অযোগ্য ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে চাকরি পায় বা যখন নিম্নমানের রাস্তা তৈরি করে পকেট ভারী করা হয়, তখন সেই ব্যক্তির পরিবার নতুন গহনা পরে বা বিদেশে পড়তে যায়। রাস্তাটি দুই বছরের মধ্যে ভেঙে পড়লেও তত দিনে পরিবারটি সমাজে "সম্মানিত" হয়ে গেছে।
কেন পরিবার নীরব থাকে?
পরিবারের ইজ্জত রক্ষা, আয়ের উৎস বন্ধ হওয়ার ভয় এবং "সবাই করে" এমন মানসিকতা পরিবারগুলোকে চুপ করে থাকতে বাধ্য করে। সামাজিক চাপও এখানে বড় ভূমিকা রাখে।
প্রতিকারের পথ
ক) পরিবারের মধ্যে সংস্কৃতি বদল
- প্রথম পদক্ষেপ: "টাকা কোথা থেকে এল?" জিজ্ঞেস করা শিখুন।
- দ্বিতীয় পদক্ষেপ: সন্তানদের সামনে সততার উদাহরণ সৃষ্টি করুন।
- তৃতীয় পদক্ষেপ: অন্যায়ের ক্ষেত্রে "না" বলতে শিখুন।
- চতুর্থ পদক্ষেপ: সম্পদের উৎস নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন।
খ) সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন
- বিয়ের বাজারে আয়ের পরিমাণের চেয়ে আয়ের উৎসকে গুরুত্ব দিন।
- সাফল্যের সংজ্ঞা পরিবর্তন করুন; সততাই হোক সফলতার মাপকাঠি।
- সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবারের সম্পদ বিবরণী জনসম্মুখে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা।
- স্কুল-কলেজে নৈতিক শিক্ষার বাস্তব চর্চা বাড়ানো।
আশার আলো
প্রতিটি অন্ধকারের মধ্যেও আলো থাকে। এক স্কুল শিক্ষক সারাজীবন সৎ থেকেছেন। অবসরের পর তাঁর বাড়ি-গাড়ি নেই, কিন্তু হাজারো সফল ছাত্র আছে। তাঁর ছেলে যখন জিজ্ঞেস করল কেন তিনি এত কষ্ট করলেন, তিনি বললেন, "বাবা, আমি রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারি।" সেই ছেলে আজ একজন সৎ প্রকৌশলী। এভাবেই বদলায় সমাজ—একটি পরিবার থেকে।
বৃক্ষের শেকড় বদলাতে হবে
যে গাছের শেকড় পচে গেছে, সে গাছে যত পানিই দাও, ফল ধরবে না। আগে শেকড় সারাও। দুর্নীতি শুধু আইন দিয়ে দূর হবে না। দুর্নীতি দূর হবে যখন প্রতিটি পরিবার ঠিক করবে: "আমাদের বাড়িতে এটা চলবে না।" এই সিদ্ধান্ত আজই নেওয়া যায়—আপনার পরিবার থেকে, আমার পরিবার থেকে।
"যে গাছের শেকড় পচে গেছে, সে গাছে যত পানিই দাও, ফল ধরবে না। আগে শেকড় সারাও।"
আপনার পরিবার কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার?
আপনার মতামত জানান এবং সমাজ পরিবর্তনে অংশ নিন।
আপনার মতামত দিন
