সামনেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০২৬। চারপাশে নানা আলোচনা, নানা সমীকরণ। কিন্তু সংসদের জাঁকজমকপূর্ণ চেয়ারে যারাই বসুন না কেন, তাদের কাছে আমার—একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত নাগরিকের—প্রত্যাশার ঝুলিটা খুব বেশি ভারী নয়। আবার খুব হালকাও নয়।
আমার চাওয়াগুলো বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। খুব ছোট করে বলতে গেলে আমি মূলত তিনটি জিনিস চাই: সবার জন্য বিনামূল্যে খাদ্য, বিনামূল্যে চিকিৎসা, এবং বিনামূল্যে শিক্ষা। আসুন, একটু গভীরে গিয়ে বলি।
১. ক্ষুধার্তের আর্তনাদহীন এক ভোর
আমার প্রথম প্রত্যাশা খুব সরল। আমি চাই, আমার রাষ্ট্রের, আমার এই মাতৃভূমির কোনো মানুষ যেন রাতে না খেয়ে ঘুমাতে না যায়। ক্ষুধায় যেন কেউ কষ্ট না পায়।
একটি পাখির বাসার কথা ভাবুন। মা পাখিটি যখন খাবার নিয়ে ফেরে, সে কি বেছে বেছে শক্তিশালী ছানাটিকে খাওয়ায় আর দুর্বলটিকে অভুক্ত রাখে? না। রাষ্ট্র হলো সেই বিশাল পাখির বাসা।
আমরা দালানকোঠা বানাচ্ছি, উড়ালসেতু বানাচ্ছি, কিন্তু সেই সেতুর নিচেই যদি কোনো জীর্ণশীর্ণ মানুষ এক মুঠো ভাতের জন্য হাত পাতে, তবে সেই উন্নয়নের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়। সরকার যেই আসুক, তাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন ভাতের অভাবে কোনো প্রাণ ঝরে না যায়।
২. অর্থের মানদণ্ডে জীবনের মূল্য নয়
দ্বিতীয়ত, আমি চাই চিকিৎসা হোক সবার জন্য উন্মুক্ত এবং মানসম্মত। বর্তমানে আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই শোচনীয়, আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা যেন এক বিলাসদ্রব্য।
শরীরের কোনো এক অঙ্গে পচন ধরলে পুরো শরীর যেমন কষ্ট পায়, তেমনি সমাজের গরিব অংশটি ধুঁকে ধুঁকে মরলে ধনী অংশটি কখনোই পুরোপুরি নিরাপদ থাকতে পারে না। রোগ ধনী-গরিব চেনে না, তবে চিকিৎসা ব্যবস্থা কেন চিনবে?
আমি এমন এক স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাই যেখানে "টাকা নেই" বলে কাউকে হাসপাতাল থেকে ফিরে যেতে হবে না। সরকারি হাসপাতালে ঔষধ বিনামূল্যে পাওয়াটা যেন অলীক কল্পনা না হয়। এমনকি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে, যাতে তারা কেবল মুনাফার মেশিন না হয়ে, সেবার মানসিকতা নিয়ে অসচ্ছলদের পাশে দাঁড়ায় এবং নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে সেবা দেয়।
৩. মানুষ গড়ার কারিগর ও শিক্ষার আলো
তৃতীয়ত, আমার প্রত্যাশা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার, যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা হবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। শিক্ষার উপকরণ—বই, খাতা, কলম—সবই রাষ্ট্র প্রদান করবে। শিক্ষায় কোনো বৈষম্য থাকবে না।
শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নিয়েও আমার স্পষ্ট দাবি আছে। আমাদের শিক্ষকরা যেন শ্রেণিকক্ষের চেয়ে কোচিং সেন্টারে বা অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনে মনোযোগী না হন, তার জন্য তাদের অভাব দূর করতে হবে।
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি শক্তিশালী, মেধাবী, মনোযোগী ও কর্মঠ প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলতে মহান শিক্ষকদের কোনো বিকল্প নেই। একজন কৃষক যেমন যত্ন করে চারাগাছ বড় করেন, শিক্ষকরাও তেমনি আমাদের সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করে তোলেন।
৪. মাকড়সার জাল নয়, লোহার শেকল চাই
বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আমার প্রত্যাশা একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী কাঠামোর। আমরা অতীতে দেখেছি, আইন যেন মাকড়সার জালের মতো—ছোট পোকা সেখানে আটকে যায়, কিন্তু বড় ভোমরা বা ভীমরুল, অর্থাৎ প্রভাবশালী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ বা খুনিরা সেটা ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়।
আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে যেন অপরাধীরা মুক্ত আকাশে ঘুরে বেড়াতে না পারে। বিচার বিভাগকে হতে হবে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত, যেন অপরাধী তার প্রাপ্য শাস্তি পায় এবং সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পায়।
৫. কণ্টকহীন পুষ্পকানন: নারীর নিরাপত্তা
আমার দেশের মেয়েরা, মায়েরা যেন রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে এবং ঘরে সম্পূর্ণ নিরাপদে চলাচল করতে পারে। কোনো মেয়েকে যেন হেনস্থার শিকার হতে না হয়, ধর্ষণের মতো বিভীষিকার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।
একটি বাগানে যদি ফুল ফোটার আগেই কেউ তা ছিঁড়ে ফেলে বা পিষে ফেলে, তবে সেই বাগান আর বাগান থাকে না, তা হয়ে ওঠে জঙ্গল। আমাদের সমাজকে জঙ্গল হওয়া থেকে বাঁচাতে হবে।
ধর্ষণকারী এবং নারী নির্যাতনকারীদের বিচার হতে হবে দ্রুততম সময়ে এবং সর্বোচ্চ শাস্তির মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক হতে হবে। এমন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যেন ভবিষ্যতে কেউ এমন জঘন্য অপরাধ করার সাহস না পায়।
৬. কর্মঠ হাত, হাসোজ্জ্বল মুখ (বেকারত্ব দূরীকরণ)
আমি চাই আমার দেশের বেকার ছেলেমেয়েদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। যে বেকার, সেই শুধুমাত্র জানে বেকারত্বের কষ্ট, বেকারত্বের গ্লানি; এটা তার এবং তার পরিবারের জন্য এক অভিশাপ হয়ে ওঠে।
একটি নদীতে যদি বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখা হয়, তবে সেই পানি পচে যায়। ঠিক তেমনি, আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী হলো সেই শক্তির স্রোত, যা কাজে না লাগালে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সরকারি এবং বেসরকারি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের বেকারত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব। সরকার উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদানসহ নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। আমাদের যুবশক্তিকে বোঝা না ভেবে সম্পদ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।
৭. মাঝির হাতে হাল, বৈমানিকের হাতে বিমান
সবশেষে, আমি চাই "যোগ্য স্থানে যোগ্য লোক"। আমাদের প্রশাসনে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই দেখা যায় অযোগ্যরা ক্ষমতার জোরে বা "মামা-খালুর" জোরে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছে। তারা তোষামোদিতে পটু হতে পারে, কিন্তু কাজে নয়।
আপনি যদি বিমানের ককপিটে একজন দক্ষ মাঝিকে বসিয়ে দেন, আর মাঝনদীতে ঝড়ের কবলে পড়া নৌকার হাল একজন দক্ষ পাইলটের হাতে দেন—তবে বিমানও ধ্বংস হবে, নৌকাও ডুববে।
যোগ্য ব্যক্তিরা যদি তাদের যোগ্য স্থানে যেতে না পারে, তবে সেই ব্যর্থতা রাষ্ট্রের, সেই ব্যর্থতা জাতির। একটি সফল রাষ্ট্র গড়তে হলে তোষামোদির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। তবেই ২০২৬ সালের পরে আমরা এক নতুন বাংলাদেশ দেখতে পাব।
প্রত্যাশার তালিকাটি হয়তো দীর্ঘ মনে হতে পারে, কিন্তু একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এটুকু চাওয়া কি খুব বেশি? দিনশেষে আমরা সবাই একটাই স্বপ্ন দেখি—"সবার আগে বাংলাদেশ"।
