আমাদের বাংলাদেশের মতো এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে আমার মনে হয় না। দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি পরিবারের অলিতে-গলিতে আজ একটাই হাহাকার—"চাকরি নেই, চাকরি নেই, চাকরি নেই।" বছরের পর বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং পরিবারের বিপুল অর্থ ব্যয় করে অর্জিত একটি উচ্চতর ডিগ্রি যখন একজন তরুণের হাতে কেবল এক টুকরো কাগজ হিসেবেই থেকে যায়, তখন হতাশা আর অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না।
কিন্তু এই যে লক্ষ লক্ষ তরুণের স্বপ্নভঙ্গ, এই যে সীমাহীন ব্যর্থতার বোঝা—এর দায় আসলে কার? এই দায় কি শুধুমাত্র সেই ছাত্র বা ছাত্রীর, যে তার জীবনের সেরা সময়টুকু পড়াশোনার পেছনে ব্যয় করেছে? নাকি এই ব্যর্থতার দায় রাষ্ট্রের, যে তার নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে পারেনি?
শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ যাত্রা এবং কঠিন বাস্তবতা
আমাদের দেশে একজন শিক্ষার্থীকে প্রায় সতেরো থেকে বিশ বছর পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয় একটি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য। শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের মূল্যবান সময়গুলো তারা বইয়ের পাতায় উৎসর্গ করে। পরিবার তাদের পেছনে তাদের সর্বস্ব বিনিয়োগ করে—শুধু আর্থিক নয়, মানসিক এবং সামাজিক সমর্থনও। সাধারণত ২৪ বা ২৫ বছর বয়সের মধ্যে একজন ছাত্র বা ছাত্রী তার স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে চাকরির বাজারে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত হন।
আর ঠিক তখনই তাদের জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে বড় আঘাত—চাকরি না পাওয়ার নির্মম বেদনা। যে ডিগ্রিটিকে তারা এত দিন ধরে সোনালি ভবিষ্যতের চাবিকাঠি ভেবে এসেছে, সেটিই যেন তাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়। ডিগ্রির ভারে তারা ন্যুব্জ, কিন্তু সেই ডিগ্রির কোনো বাস্তব মূল্য তারা খুঁজে পায় না।
ব্যর্থতার দায়: ব্যক্তি বনাম রাষ্ট্র
অনেকেই হয়তো বলবেন, ছাত্রছাত্রীরা সঠিকভাবে পড়াশোনা করে না, তাদের দক্ষতার অভাব রয়েছে, তাই তারা চাকরি পায় না। এই যুক্তির কিছুটা সত্যতা থাকলেও, এটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। যখন লক্ষ লক্ষ স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার থাকে, তখন সমস্যাটি আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতায় পরিণত হয়।
আমরা কেন আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছি, সেই প্রশ্নটি আজ সবচেয়ে জরুরি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি চাকরির বাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আমরা কি এমন বিষয়ে লক্ষ লক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি, যেগুলোর জন্য দেশে পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগই নেই? এই বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।
সমাধানের পথে কিছু জরুরি পদক্ষেপ
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রকে সবচেয়ে সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি:
- চাহিদা ও জোগানের সঠিক বিশ্লেষণ: রাষ্ট্রকে প্রথমেই একটি জরিপ বা গবেষণা করে বের করতে হবে যে, আমাদের দেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য মোট কতটি কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে এবং কোন কোন খাতে কী ধরনের বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন।
- স্নাতকদের সংখ্যার সাথে সমন্বয়: প্রতি বছর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে কতজন স্নাতক ডিগ্রিধারী চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে, তার একটি সঠিক পরিসংখ্যান থাকতে হবে। এই সংখ্যার সাথে দেশের কর্মসংস্থানের সুযোগের একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন সংখ্যা এবং বিভাগের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর হতে হবে।
- কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ: রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তার প্রতিটি শিক্ষিত নাগরিকের জন্য কোনো না কোনো ধরনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এটি হতে পারে সরকারি চাকরি, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে সহায়তা, অথবা উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
- দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা: শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যার ওপর জোর না দিয়ে, শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বেশি কর্মমুখী এবং দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। শিল্পের চাহিদার সাথে মিল রেখে পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে, যাতে একজন গ্র্যাজুয়েট পড়াশোনা শেষ করেই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করে।
দিনশেষে কথা একটাই—যদি রাষ্ট্র তার শিক্ষিত নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তাহলে শুধু শুধু ডিগ্রি ছাপিয়ে এবং বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। এই ব্যর্থতার দায় এককভাবে কোনো শিক্ষার্থীর উপর চাপিয়ে দেওয়া একটি চরম অন্যায়। এটি একটি সম্মিলিত ব্যর্থতা, এবং এর দায় রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই নিতে হবে। তরুণদের স্বপ্নকে এভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে কোনো জাতি কখনোই উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না।
আমার অন্যান্য লেখা পড়তে আগ্রহী?
আমাদের মেডিকেল কলেজগুলোতে হাসপাতাল আছে, কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্ডাস্ট্রি নেই কেন?
লেখাটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন
