গণতন্ত্রের মুক্তি: দল নয়, বাছুন যোগ্য নেতৃত্ব

Share:
Choose Good Leader Over Party

স্বাধীনতার ৫৪ বছর ও আমাদের ভ্রান্তি

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিন বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু আমাদের অন্তরের হাহাকার বদলায় না—আমরা কি আসলেই স্বাধীন হতে পেরেছি? প্রতিবার আমরা গণতন্ত্র খুঁজি, মুক্তি খুঁজি। ২০২৪-এর বিপ্লবের পরেও আমরা সেই একই প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

আমরা খুব সহজেই আঙুল তুলি রাজনৈতিক নেতাদের দিকে। বলি, "নেতারা দেশটা ধ্বংস করে দিল।" কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কি কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেছি? সত্যিটা হলো, এই ব্যর্থতার দায় আমাদেরও। আমরা সাধারণ জনগণ কি আসলেই দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাই? নাকি আমরা নিজেরাই দুর্নীতির এই চাকার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছি?

লোভ যখন নৈতিকতাকে গ্রাস করে

আমাদের প্রধান সমস্যা হলো আমাদের লোভ। ভালো কাজ করার চেয়ে নিজের আখের গোছানো আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের কথাই ধরুন—শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় হাজার হাজার প্রার্থী ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছে।

যে শিক্ষক ঘুষ দিয়ে চাকরিতে ঢোকেন, তিনি ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের কী শেখাবেন? সততা? নাকি কীভাবে ভবিষ্যতে ঘুষ দিয়ে কাজ আদায় করতে হয়? তিনি তো শুরুতেই দুর্নীতির কাছে নিজের আত্মসম্মান বিক্রি করে দিয়েছেন। এই বিষাক্ত বীজ থেকেই জন্ম নেয় আগামীর দুর্নীতিগ্রস্ত প্রজন্ম।

সিন্ডিকেটের মায়াজাল

আমরা এক অদ্ভুত চক্রের মধ্যে আটকা পড়েছি। নেতা বদলায়, মুখ বদলায়, কিন্তু চেয়ারের চরিত্র বদলায় না। কারণ, সেই চেয়ারে বসা মানুষটি আমাদেরই প্রতিচ্ছবি।

  • সবাই যখন জড়িত: সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই সিন্ডিকেট। সরকারি অফিস থেকে শুরু করে বাজারের দোকান—কোথাও না কোথাও আমরাও এই অনিয়মের সুবিধা নিচ্ছি।
  • পারিবারিক দায়বদ্ধতা: আমরা কখনোই পরিবারের মানুষকে জিজ্ঞেস করি না, "তোমার এই বাড়তি টাকা কোথা থেকে এল?" বাবা, ভাই বা স্বামী যখন ঘুষের টাকায় উপহার আনেন, আমরা সানন্দে তা গ্রহণ করি। আমরা পরোক্ষভাবে এই অবৈধ ব্যবস্থাকে বৈধতা দিচ্ছি।

দোষ কি শুধুই সিস্টেমের?

আমরা সিস্টেমকে গালি দেই, সরকারকে দোষারোপ করি। কিন্তু আমরাই তো এই সিস্টেমের জ্বালানি। সমাজের ৩০-৪০ শতাংশ মানুষ আজ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। তাদের হাতেই টাকা, তাদের হাতেই ক্ষমতা।

বাকি যে সৎ মানুষগুলো আছেন, তাদের গলার স্বর এই টাকার ঝনঝনানিতে চাপা পড়ে যায়। সমাজে ভালো মানুষের কদর কমে গেছে, কারণ সেখানে 'টাকা'ই শেষ কথা। বৈধ বা অবৈধ—তা দেখার সময় কারো নেই।

আমাদের প্রতিদিনের দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র

আমরা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলি, কিন্তু আমাদের কাজকর্মে তার প্রতিফলন কতটুকু? নিচের চিত্রগুলো মিলিয়ে দেখুন, আমরা কীভাবে নিজেদের অজান্তেই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছি:

  • ভোটের আমানত বিক্রি: সামান্য টাকার লোভে আমরা যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে ভোট বিক্রি করি, আর পরে সেই নেতারাই আমাদের শোষণ করে।
  • স্বজনপ্রীতির চশমা: নেতার যোগ্যতা নয়, বরং তিনি আমার 'চাচা' বা 'ভাই' কি না—সেটাই আমাদের দেখার বিষয়। যোগ্যতার চেয়ে আত্মীয়তাই আমাদের কাছে বড়।
  • ঘুষ দিয়ে চাকরি: আমরা জমি বিক্রি করে ঘুষ দিয়ে চাকরি নিই, আর সেই টাকা উশুল করতে গিয়ে নিজেরাই দুর্নীতিবাজ হয়ে উঠি।
  • আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা: ট্রাফিক আইন ভাঙলে জরিমানা না দিয়ে সার্জেন্টকে 'চা-পানির' টাকা সাধি। আমরা আইন চাই, কিন্তু মানতে চাই না।
  • অবৈধ সুবিধা: বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বিল বাঁচাতে অবৈধ সংযোগ নিই, অথচ লোডশেডিং হলে সরকারকে গালি দিতে ছাড়ি না।
  • ক্ষমতার তোষামোদ: এলাকার মাস্তান বা দুর্নীতিবাজদের আমরাই 'ভাই' ডেকে মাথায় তুলি, কারণ বিপদে তাদের অবৈধ ক্ষমতার সুবিধা নেওয়া যাবে।
  • বাজার সিন্ডিকেট: সুযোগ পেলেই আমরা ঈদের আগে পণ্যের দাম বাড়াই বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করি। বড় সিন্ডিকেটকে গালি দিলেও ছোট পরিসরে আমরাও একই কাজ করি।
  • শিক্ষায় অনিয়ম: সন্তানের ভালো রেজাল্টের জন্য অভিভাবকরাই যখন প্রশ্নফাঁস বা নকলের খোঁজ করেন, তখন নৈতিকতা শিখবে কে?
  • কাজে ফাঁকি ও চুরি: ঠিকাদার রডের বদলে বাঁশ দেয়, আর অফিসারা ফাইলে সই করতে টাকা চায়—এরা কেউ ভিনগ্রহের নয়, আমাদেরই ভাই-বন্ধু।
  • প্রতিবাদের অভাব: চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখেও "ঝামেলায় জড়াব না" বলে চুপ থাকি। আমাদের এই নীরবতাই অপরাধীদের সাহস যোগায়।

সিদ্ধান্ত আপনার হাতে

এখন সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। আপনি কি অন্ধের মতো কোনো দলের প্রতীক দেখে ভোট দেবেন, নাকি মানুষটিকে বিচার করবেন? মনে রাখবেন, দল খারাপ হতে পারে, কিন্তু সেই দলের ভেতরও ভালো মানুষ থাকতে পারে। আবার ভালো দলের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়ংকর দুর্নীতিবাজ।

যদি আমরা ভুল মানুষ নির্বাচন করি:

  • গণতন্ত্র মারা যাবে।
  • মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে।
  • অবিচার আর ঘুষের রাজত্ব কায়েম হবে।
  • এবং দিনশেষে, এর ভুক্তভোগী হব আমরাই।

মানুষ খুঁজুন, মার্কা নয়

দলের নাম কী, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো প্রার্থী কেমন মানুষ। আগামীর বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের দলকানা স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন সৎ, যোগ্য এবং মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন নেতাকে বেছে নিন—সে যে দলেরই হোক না কেন।

"আপনার একটি সঠিক সিদ্ধান্তই পারে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে। দল নয়, দেশের স্বার্থে ভালো মানুষ খুঁজুন।"

আপনি কি একমত?

আপনার মতামত আমাদের জানান এবং সমাজ পরিবর্তনে অংশ নিন।

আপনার মতামত দিন
Raihan Khan

Raihan Khan

AI & Systems Architect, Entrepreneur, e-GP Specialist & Writer

A versatile AI & systems architect and entrepreneur with 10+ years of experience across e-Government systems, software architecture, and project management. Founder of ABCL TECH, Chakri Bangla, Visa Bangla, and e-GP Bangla — alongside writing on technology, society, and personal reflection.