আজ বিশ্ব মা দিবস। আসলে জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি উদযাপন, প্রতিটি মুহূর্তেই তো মায়ের কথা মনে পড়ে। হয়তো ঘটা করে সারা বিশ্ব আজ মা দিবস পালন করছে, তবে আমার কাছে মা দিবস প্রতিদিন। এর পিছনে আমার কিছু ব্যক্তিগত কারণ আছে।
আমার কাছে আমার মা আমার পুরো পৃথিবী। একজন অভিযোগ-অনুযোগ বিহীন মানুষ, যার কাছে ব্যর্থহীনভাবে মনের সব কথা অকপটে বলা যায়। ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করা যায়। এত বায়না, এত আবদার, এত এত ব্যর্থতা—কোন কিছু নিয়েই কোনদিন অভিযোগ করেননি। কখনোই আমার কোন ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। কখনোই আমার পিছিয়ে পড়া নিয়ে অভিযোগ করেননি। আমার শত শত বায়না, হাজারো আবদার মেটাতে গিয়ে কখনো বিরক্ত হননি। আমার শত শত রাগ, হাজারো অভিমানে মা কখনো আমাকে দূরে ঠেলে দেননি।
মায়ের বিশ্বাস: আমার সবচেয়ে বড় শক্তি
আমার ছোট ছোট সফলতায় মা এতটাই খুশি হন, সেটা বলাই বাহুল্য। আবার আমার বহু ব্যর্থতার একমাত্র দুঃখের সাথী আমার মা। আমার প্রতি আমার মায়ের এত দৃঢ় বিশ্বাস দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই। মা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন—আমাকে দিয়েই হবে। সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে আমি পৌঁছাতেই পারবো।
ছোটবেলা থেকেই আমার সবকিছুতেই আমার প্রথম শেখা আমার মায়ের কাছে। সেই প্রথম হাঁটতে শেখা, প্রথম কথা বলতে শেখা, প্রথম বর্ণমালা শেখা, প্রথম পড়তে শেখা, প্রথম লিখতে শেখা—সবকিছুতেই মায়ের বিশ্বাস, “আমি পারবো।”
শহরে থেকেও যিনি গ্রামকে ধরে রেখেছেন
আমার মায়ের ব্যাপারে যদি বলতে হয়, আমার মা প্রচন্ড ধর্মভীরু একজন মানুষ। শহরে বড় হলেও, গ্রামের সুজলা-সুফলা আর শস্য-শ্যামলা পরিবেশে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবন। শহরে থেকেও যে গ্রামকে এত বেশি ভালোবাসা যায়, সেটা মাকে দেখেই শিখেছি। জীবিকার তাগিদে হয়তো শহরে জীবন কাটাচ্ছি আমরা, তবে মায়ের আদেশ—শেষ বয়সে ফিরে যেতে হবে গ্রামে।
“মানুষের মতো মানুষ” হওয়ার পাঠ
মানুষের জীবনে মানুষের মতো মানুষ হওয়াটা যে কত জরুরি, সেটাও মা শিখিয়েছেন আমাদেরকে। শুধুমাত্র পড়ালেখা জানলে যে মানুষ হওয়া যায় না, মানুষ হওয়ার জন্য যে মানবিক গুণাবলী থাকতে হয়, সেগুলো মা বলেছেন আমাকে। কোনদিন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ না করেও যে মানুষের মতো মানুষ হওয়া যায়, সেটা শিখেছি মায়ের কাছ থেকে।
এইতো কিছুদিন আগে দেখলাম মায়ের হাতে লেখা তাঁর একটি নোট খাতা। উনি এখনো বাংলাকে ধারণ করেন মনেপ্রাণে। কোন একটা কাজের প্রয়োজনে উনার নোট খাতাটি দেখছিলাম, হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটি জায়গায়—উনি এখনো কোন কিছু লিখতে গেলে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা তারিখ-মাস-বছর এবং আরবি তারিখ-মাস-বছর একসাথেই লিখে তারপর ওনার নোট শুরু করেন। এই ছোট্ট অভ্যাসটাই আমাকে বুঝিয়ে দেয়—শিকড় ভোলেননি, ভুলবেনও না।
“তুমি চেষ্টা করো, বাকিটা আল্লাহর ভরসা”
আমার মা কখনোই আমাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে কোন প্রকার জোরাজুরি করেননি। উনি সবসময় বলেছেন—
“তুমি তোমার জন্য যেটা ভালো মনে কর, সেটাই বেছে নাও। সে বিষয়ে লেখাপড়া কর। দেখবে সফলতা একদিন না একদিন আসবেই। আর সফলতা না আসলেও কোন সমস্যা নেই, তুমি যে চেষ্টা করছো সেটা তো উপরওয়ালা দেখছেন। তুমি চেষ্টা করে যাও, বাকিটা আল্লাহর ভরসা। তোমার জন্য যদি এটা মঙ্গলময় হয়, অবশ্যই আল্লাহ তোমাকে এটা দেবেন।”
এই কথাগুলো এখনো কঠিন সময়ে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে শেখায়।
শত মাইলের দূরত্ব, তবু মা সবার আগে টের পান
আমি সাধারণত অসুখ-বিসুখ হলে মাকে খুব বেশি একটা জানাতে চাই না। কারণ আমি শহরে থাকি, মা গ্রামে থাকেন—শত মাইলের দূরত্ব। মা আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন বিধায় মাকে আমার অসুস্থতার খবর জানাতে চাই না। কিন্তু মা তো মা-ই। কিভাবে যেন বুঝে ফেলেন আমার শরীর খারাপ, আমি অসুস্থ হয়ে গেছি।
আমি অসুস্থ হলে আমার মায়ের দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য কখনো আমার মাকে জানাতে চাই না। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো—আমি অসুস্থ হওয়ার সাথে সাথেই সর্বপ্রথম যে ফোনটি আমি পাই, সেটা আমার মায়ের কাছ থেকেই। সৃষ্টিকর্তার এ যেন এক অজানা রহস্য।
মায়ের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়
মাকে নিয়ে লিখতে গেলে লেখা শেষ হবে না কখনোই। মায়ের ঋণ কখনোই শোধ করতে পারবো না। মায়ের ঋণ কখনোই শোধ হবার নয়। তবে সুযোগ থাকলে আমার মাকে পুরো পৃথিবীটাই দিয়ে দিতে চাই।
আজ বিশ্ব মা দিবসে আমার নামটি লিখে দিলাম তোমার চরণতলে, মা।
পৃথিবীর সকল মায়েদের জানাই বিশ্ব মা দিবসের শুভেচ্ছা। যাদের মা আজ পাশে আছেন—তাঁকে জড়িয়ে ধরুন, একটাবার বলুন “মা, ভালোবাসি।” আর যাঁদের মা আজ পৃথিবীতে নেই—তাঁদের জন্য একটি দোয়া।
Share your love for your mother!
Leave a comment below and share this post with your friends and family.
Contact Me