শৈশবের পাঠ্যবইয়ের পাতায় পড়া সেই লাইনগুলো আজও মনের গহীনে এক অদ্ভুত দোলা দেয়—"গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ।" আমার কাছে বাঙালিয়ানা মানে কোনো তাত্ত্বিক সংজ্ঞা নয়, বরং স্মৃতির মণিকোঠায় জমে থাকা এক সজীব চিত্র। যেখানে বারো মাসই বাড়ির উঠোনে আর মাচায় পাওয়া যেত হরেক রকমের শাক-সবজি, আর বাতাসের ঘ্রাণে মিশে থাকত মাটির সোঁদা গন্ধ।
আমার কাছে বাঙালিয়ানা মানে বৈশাখের সেই রুদ্র রূপ আর নবান্ন উৎসবের স্নিগ্ধতা। যখন নতুন ধান উঠত, তখন কৃষকের ঘরে ঘরে যে আনন্দযজ্ঞ শুরু হতো, তার তুলনা কোনো আধুনিক বিলাসিতার সাথে চলে না। নতুন ধানের চালের পান্তা ভাত, কাঁচামরিচ আর পিয়াজ—এই যেন অমৃত। বাংলা নতুন বছর মানেই ছিল মাটির টানে ফিরে যাওয়া, শিকড়ের সন্ধান করা।
শহুরে জীবনের এই দামি পারফিউমের কৃত্রিম সুবাস আমার কাছে নস্যি, যদি তার তুলনা হয় বাংলার ভেজা মাটির ঘ্রাণ বা নতুন কাটা ধানের গন্ধের সাথে। সকালে অ্যালার্ম ঘড়ির কর্কশ শব্দে নয়, বরং পাখির কলতানে ঘুম ভাঙার সেই দিনগুলো আজও আমাকে পিছু ডাকে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা সকালের নরম রোদ আর শিশিরভেজা ঘাসের স্পর্শ—এটাই তো ছিল জীবন!
কিন্তু বাস্তবতা আজ বড়ই কঠিন। জীবিকার প্রয়োজনে, উচ্চাকাঙ্ক্ষার টানে আমরা ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি। ইট-পাথরের এই শহরে "গ্রাম" এখন শুধুই এক নস্টালজিক শব্দ। গ্রামের সেই আদিমতা হারিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা হারাচ্ছি আমাদের সত্তা। শহুরে কোলাহলে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি কি সেই আমিই আছি? নাকি আমিও এই কংক্রিটের জঙ্গলের আরেকটি ইটের মতো অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছি?
তবুও মন চায় ফিরে যেতে। ফিরে যেতে চাই আমার বাংলা মায়ের কোলে, যেখানে কৃত্রিমতার কোনো স্থান নেই।
পেশাগত জীবনে হয়তো আমি একজন প্রকৌশলী বা ইঞ্জিনিয়ার। প্রযুক্তি, কোড, আর সিস্টেমের বেড়াজালই আমার বর্তমান পরিচয়। কিন্তু বিশ্বাস করুন, কৃষিভিত্তিক এই দেশে আমার ইঞ্জিনিয়ার পরিচয়ের চেয়ে "কৃষক" পরিচয়টা আমাকে অনেক বেশি টানে। আমি নিজেকে কৃষক দাবি করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ, একজন কৃষক যখন এক মুঠো বীজ মাটিতে বুনেন, তিনি শুধু ফসল ফলান না, তিনি আগামী দিনের স্বপ্ন বুনেন।
মাটির সাথে মানুষের যে নিবিড় সম্পর্ক, তা কোনো যান্ত্রিক ডিগ্রি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তাই দিনশেষে, যখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরি, তখন মনে মনে সেই মেঠোপথই খুঁজি। কারণ আমি জানি, যত বড় অট্টালিকাই গড়ি না কেন, আমার শেকড় সেই নরম কাদামাটিতেই গাঁথা।