১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। ক্যালিফোর্নিয়ার কুপারটিনোতে অ্যাপল পার্কে যা ঘটল, তা বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির ৫০ বছরের ইতিহাসে মাত্র তৃতীয়বারের মতো ঘটল — একজন স্থায়ী সিইও তার চেয়ার ছেড়ে দিলেন, আর নতুন একজন তা গ্রহণ করলেন। টিম কুক, যিনি ১৫ বছর ধরে অ্যাপলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এখন কোম্পানির এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান (Executive Chairman)। আর তার জায়গায় সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিলেন হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রধান জন টার্নাস — এমন একজন মানুষ, যিনি গত ২৪ বছর ধরে পর্দার আড়ালে থেকে আইফোন, আইপ্যাড আর ম্যাক তৈরি করে গেছেন।
এই মুহূর্তটি শুধু একটি কর্পোরেট রদবদল নয় — এটি প্রযুক্তি জগতের সবচেয়ে বড় প্রতীকী ঘটনাগুলোর একটি। স্টিভ জবসের উদ্ভাবনী দূরদর্শিতা থেকে টিম কুকের কৌশলগত দক্ষতা, আর এখন জন টার্নাসের হাতে অ্যাপলের ভবিষ্যৎ — এই লেখায় আমি তিন যুগের এই যাত্রা, ক্ষমতা হস্তান্তরের নেপথ্যের গল্প, এবং টার্নাসের সামনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. স্টিভ জবস: যিনি একটি গ্যারেজ থেকে অ্যাপলের জন্ম দিয়েছিলেন
১৯৭৬ সালে স্টিভ জবস, স্টিভ ওজনিয়াক আর রোনাল্ড ওয়েনের হাত ধরে একটি গ্যারেজে যাত্রা শুরু করে অ্যাপল। জবসের নেতৃত্বে ম্যাকিনটোশ (Macintosh)-এর মতো যুগান্তকারী পণ্য আসে, কিন্তু ১৯৮৫ সালে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে তাকেই নিজের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এটি প্রযুক্তি জগতের অন্যতম বিখ্যাত এবং নাটকীয় ঘটনা।
কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। ১৯৯৭ সালে জবস আবার অ্যাপলে ফিরে আসেন, তখন কোম্পানিটি প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে। পরবর্তী ১৪ বছরে তিনি অ্যাপলকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে তোলেন — আইম্যাক (iMac), আইপড (iPod), আইটিউনস, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ২০০৭ সালে আইফোন। আইফোন শুধু একটি পণ্য ছিল না, এটি পুরো মোবাইল প্রযুক্তি শিল্পকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিল। ২০১০ সালে আইপ্যাডের মাধ্যমে ট্যাবলেট বাজারও তিনি নতুন করে তৈরি করেন।
২০১১ সালের ২৪ আগস্ট, অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর স্বাস্থ্যগত কারণে জবস সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহকর্মী টিম কুকের হাতে দায়িত্ব তুলে দেন। মাত্র ছয় সপ্তাহ পর, ৫ অক্টোবর ২০১১ সালে, ৫৬ বছর বয়সে স্টিভ জবস মারা যান। তিনি রেখে যান একটি কোম্পানি, যা ইতিমধ্যেই বিশ্বকে বদলে দিয়েছে — কিন্তু ভবিষ্যৎ তখনও অনিশ্চিত ছিল।
২. টিম কুক: যিনি অ্যাপলকে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিতে পরিণত করলেন
জবসের বিপরীতে, টিম কুক ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের নেতা। যেখানে জবস ছিলেন পণ্যের দূরদর্শী স্বপ্নদ্রষ্টা, কুক ছিলেন অপারেশন ও সাপ্লাই চেইনের বিশেষজ্ঞ — এমন একজন মানুষ, যিনি নিখুঁত কৌশল দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বব্যাপী চালানোর শিল্পে দক্ষ। অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন, জবসের মতো একজন কিংবদন্তির জায়গায় কুক টিকে থাকতে পারবেন কিনা। কিন্তু পরবর্তী ১৫ বছরে তিনি সেই সন্দেহ ভুল প্রমাণ করেন।
কুক দায়িত্ব নেওয়ার সময় (২০১১) অ্যাপলের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে, তার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগে, অ্যাপল সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য স্পর্শ করে — ইতিহাসে দ্বিতীয় কোম্পানি হিসেবে এই মাইলফলক অতিক্রম করে। অর্থাৎ, কুকের নেতৃত্বে অ্যাপলের বাজারমূল্য প্রায় ১৩ গুণ বেড়েছে।
দ্রষ্টব্য: বারের দৈর্ঘ্য পাঠযোগ্যতার জন্য সমন্বয় করা হয়েছে, প্রতিটি অঙ্ক প্রকৃত সরকারি ঘোষিত বাজারমূল্যের কাছাকাছি একটি আনুমানিক চিত্র।
কিন্তু সংখ্যার বাইরেও কুকের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল অ্যাপলের ব্যবসায়িক মডেলকে নতুন করে গড়ে তোলা। জবসের যুগে অ্যাপল ছিল মূলত একটি হার্ডওয়্যার কোম্পানি, যা পণ্য চক্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। কুক অ্যাপলকে একটি বিশাল, পুনরাবৃত্ত-আয়ের (Recurring Revenue) সার্ভিস ব্যবসায় রূপান্তরিত করেন — অ্যাপ স্টোর, আইক্লাউড, অ্যাপল মিউজিক, অ্যাপল পে, অ্যাপল টিভি+। পাশাপাশি তার যুগেই এসেছে অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অর্জন — অ্যাপল সিলিকন (Apple Silicon), নিজস্ব M-সিরিজ চিপ, যা ম্যাক কম্পিউটারের কার্যক্ষমতা ও ব্যাটারি লাইফকে সম্পূর্ণ নতুন এক স্তরে নিয়ে যায়।
৩. জন টার্নাস: পর্দার আড়ালের ইঞ্জিনিয়ার, এখন অ্যাপলের মুখ
জন টার্নাস অ্যাপলের বাইরে খুব বেশি পরিচিত নাম ছিলেন না — কিন্তু কোম্পানির ভেতরে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল সিদ্ধান্তগুলোর কেন্দ্রে ছিলেন। ১৯৯৭ সালে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক করার পর তিনি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভার্চুয়াল রিসার্চ সিস্টেমসে (Virtual Research Systems) কাজ শুরু করেন — একটি অভিজ্ঞতা, যা পরবর্তীতে অ্যাপল ভিশন প্রো (Vision Pro) তৈরিতে বিশেষভাবে কাজে লাগে।
২০০১ সালে তিনি অ্যাপলের প্রোডাক্ট ডিজাইন দলে যোগ দেন। ২০১৩ সালে হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট, এবং ২০২১ সালে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাহী দলে জায়গা করে নেন। তার হাত দিয়ে গেছে আইফোন, আইপ্যাড, ম্যাক, অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস এবং ভিশন প্রো-র হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং — আইপ্যাডের একদম প্রথম প্রজন্ম থেকে শুরু করে প্রতিটি সংস্করণে তার সরাসরি তত্ত্বাবধান ছিল।
টিম কুক অপারেশন থেকে উঠে আসা সিইও ছিলেন। জন টার্নাস প্রকৌশল ও পণ্য উন্নয়ন থেকে উঠে আসা সিইও — অনেকটা স্টিভ জবসের ধাঁচের কাছাকাছি, যদিও তার ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ আলাদা। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন ইঙ্গিত দেয় যে অ্যাপল বোর্ড আবার পণ্য-কেন্দ্রিক নেতৃত্বে ফিরে যেতে চাইছে।
৪. ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬: ঐতিহাসিক ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন
এই পরিবর্তন হঠাৎ ঘটেনি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে অ্যাপল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে টিম কুক এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হবেন এবং জন টার্নাস সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেবেন — একটি সুপরিকল্পিত, কয়েক মাস ধরে প্রস্তুত করা উত্তরাধিকার পরিকল্পনা। নিচের সময়রেখায় অ্যাপলের নেতৃত্বের সম্পূর্ণ ইতিহাস দেখা যাক:
তার শেষ দিনে কর্মীদের উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে টিম কুক লেখেন:
অন্যদিকে সিইও হিসেবে তার প্রথম অভ্যন্তরীণ মেমোতে জন টার্নাস কর্মীদের উজ্জীবিত করে জানান, "আগামী সপ্তাহে একটি বিশাল লঞ্চ" অপেক্ষা করছে — ইঙ্গিত ছিল ৯ সেপ্টেম্বরের অ্যাপলের বার্ষিক ফল ইভেন্টের দিকে, যেখানে আইফোন ১৮ প্রো এবং আইফোন আল্ট্রা লাইনআপ উন্মোচিত হওয়ার কথা। নতুন সিইও হিসেবে তার প্রথম প্রকাশ্য উপস্থিতিই হতে যাচ্ছে অ্যাপলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক অনুষ্ঠানে।
৫. টার্নাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুদ্ধ
জন টার্নাস একজন প্রমাণিত হার্ডওয়্যার প্রকৌশলী, কিন্তু তার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হার্ডওয়্যার নিয়ে নয় — এটি সফটওয়্যার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। গত কয়েক বছরে গুগল (Google Gemini) এবং ওপেনএআই-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অ্যাপলের এআই কৌশল, বিশেষ করে সিরি (Siri)-এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি শিল্পে "এআই দৌড়ে" অ্যাপল কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
টার্নাসের ওপর প্রত্যাশা স্পষ্ট — তাকে প্রমাণ করতে হবে যে একজন হার্ডওয়্যার-কেন্দ্রিক নেতাও অ্যাপলকে এআই যুগে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে পারেন। তার শক্তি হলো, পণ্যের গভীর প্রযুক্তিগত বোঝাপড়া এবং বিশ্বমানের প্রকৌশল দল পরিচালনার অভিজ্ঞতা — কিন্তু এআই-চালিত সফটওয়্যার প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেতে হলে তাকে ভিন্ন ধরনের নেতৃত্বের দক্ষতাও দেখাতে হবে, যা তিনি এখনো প্রকাশ্যে প্রমাণ করেননি।
৬. তিন যুগ, তিন ধরনের নেতৃত্ব
জবস, কুক এবং টার্নাস — প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের নেতা, ভিন্ন সময়ে অ্যাপলের জন্য ভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব প্রয়োজন হয়েছিল বলেই হয়তো তারা যথাক্রমে নির্বাচিত হয়েছিলেন। নিচের তুলনাটি তিন যুগের মূল পার্থক্য তুলে ধরে:
| সিইও | মেয়াদ | মূল দক্ষতা | সবচেয়ে বড় অবদান |
|---|---|---|---|
| স্টিভ জবস | ১৯৭৬-১৯৮৫, ১৯৯৭-২০১১ | পণ্যের দূরদর্শিতা, ডিজাইন | আইফোন, আইপড, আইপ্যাড — অ্যাপলের পুনর্জন্ম |
| টিম কুক | ২০১১-২০২৬ | অপারেশন, সাপ্লাই চেইন, কৌশল | সার্ভিস ব্যবসা, $৩৫০B থেকে $৫T বাজারমূল্য |
| জন টার্নাস | ২০২৬-বর্তমান | হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, পণ্য উন্নয়ন | এখনো লেখা হচ্ছে — এআই যুগের অ্যাপল গড়ার দায়িত্ব |
একটি কোম্পানির টিকে থাকার আসল পরীক্ষা
একটি কোম্পানির প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় তখনই, যখন সে তার প্রতিষ্ঠাতা বা দীর্ঘমেয়াদী নেতার অনুপস্থিতিতেও সমান গতিতে এগিয়ে যেতে পারে। ২০১১ সালে জবসের বিদায়ের পর অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন অ্যাপলের ভবিষ্যৎ নিয়ে — কিন্তু টিম কুক ১৫ বছরে তা ভুল প্রমাণ করেছেন। এখন একই পরীক্ষায় বসতে হবে জন টার্নাসকে।
স্টিভ জবস অ্যাপলকে কল্পনা করতে শিখিয়েছিলেন, টিম কুক শিখিয়েছিলেন কীভাবে সেই কল্পনাকে বিশ্বব্যাপী স্কেলে পৌঁছে দিতে হয়। জন টার্নাসের সামনে এখন প্রশ্ন — কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই নতুন যুগে তিনি অ্যাপলকে কোন পথে নিয়ে যাবেন? উত্তরটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে, কিন্তু ৯ সেপ্টেম্বরের ইভেন্ট দিয়েই শুরু হচ্ছে তার আসল পরীক্ষা।
আপনার মতামত কী?
জন টার্নাস কি টিম কুকের মতোই সফলভাবে অ্যাপলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন, নাকি এআই যুগে অ্যাপল প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে পিছিয়ে পড়বে? আপনার মতামত জানান।
আপনার মতামত দিন
