আজ বিশ্ব বাবা দিবস। পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ তাদের বাবাকে নিয়ে কথা বলছে, স্মৃতি রোমন্থন করছে, শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। আমিও আজ আমার আব্বাকে নিয়ে লিখছি—কিন্তু এটা কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, এটা একটা ছেলের হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা কথা। আমি "বাবা" বলি না, আমি বলি "আব্বা"—এই সম্বোধনটার মধ্যে এক ধরনের আপনত্ব আছে, এক ধরনের ঘনিষ্ঠতা আছে যা "বাবা" শব্দে আমার কাছে ঠিক সেভাবে ধরা পড়ে না। যদিও আব্বাকে কখনো জড়িয়ে ধরা হয়নি—বাঙালি পরিবারের সেই চিরাচরিত সংস্কৃতিতে বাবা-ছেলের সম্পর্কে শারীরিক স্নেহ প্রকাশের রেওয়াজ খুব একটা নেই—কিন্তু পৃথিবীতে কিছু স্পেশাল মানুষ আছেন যাদের আমি "তুমি" বলে সম্বোধন করি, আমার আব্বা তাদের মধ্যে একজন। এই "তুমি" সম্বোধনটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় আদর, সবচেয়ে কাছের সম্পর্কের প্রকাশ।
মানুষের মতো মানুষ হও—আব্বার একমাত্র উপদেশ
আব্বা আমাকে কোনোদিন বলেননি যে তোমাকে ডাক্তার হতে হবে, ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে যেখানে প্রতিটি বাবা-মা তাদের সন্তানের জন্য একটি নির্দিষ্ট পেশার স্বপ্ন দেখেন, সেখানে আমার আব্বা একটু অন্যরকম। তিনি সবসময় একটাই কথা বলেছেন—"মানুষের মতো মানুষ হও।" এই ছোট্ট বাক্যটার গভীরতা কতটুকু, সেটা বয়সের সাথে সাথে আমি আরো বেশি করে অনুধাবন করছি। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার—এসব পেশাগত পরিচয়ের চেয়েও বড় পরিচয় হলো একজন প্রকৃত মানুষ হওয়া। আব্বা সেই শিক্ষাটাই দিয়েছেন আমাকে—পেশা যা-ই হোক, মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হবে।
তবে আব্বা আমাকে বাচ্চাকালে আরেকটি কথা বলেছিলেন, যেটা আমার জীবনদর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি বলেছিলেন—
"সবসময় নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করবা, আমারে বিক্রি করবা না কোথাও। আমার পরিচয়ে পরিচিত হইলে একদিন তোমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।"
এই কথাটা ভেবে দেখুন। একজন বাবা তাঁর ছেলেকে বলছেন—আমার নাম ব্যবহার করো না, আমার পরিচয়ের ছায়ায় আশ্রয় নিও না। নিজের যোগ্যতায়, নিজের পরিশ্রমে, নিজের পরিচয় গড়ে তোলো। এটা কতটুকু সাহসী একটা উপদেশ! অনেক বাবা চান তাদের সন্তান তাদের নাম ধরে পরিচিত হোক, তাদের খ্যাতির উত্তরাধিকার বহন করুক। কিন্তু আমার আব্বা চেয়েছেন আমি আমার নিজের পরিচয়ে দাঁড়াই। সেই চেষ্টা আজও করে যাচ্ছি—তবে কতটুকু সফল হয়েছি, সেটা সত্যি জানি না। কারণ আব্বার যে খ্যাতি, যে জনপ্রিয়তা—সেটা অর্জন করা আমার পক্ষে খুবই কঠিন। আসলে ছেলে যতো বড়ই হোক না কেন, বাবাকে ছাড়িয়ে যাওয়া সহজ কাজ নয়!
আব্বার অগাধ বিশ্বাস—আমার সফলতার ভিত্তি
আমি পরীক্ষায় ফেল করলে আব্বা কোনোদিন বকাবকি করেননি। কোনোদিন বলেননি "তুমি ফেল করলা ক্যান?" সবসময় বলেছেন একটাই কথা—"আরে ব্যাটা, আবার ভালো করে চেষ্টা করো। তুমি পারবা—দেখবা ভালো হবে।" এই অগাধ বিশ্বাস, এই নিঃশর্ত আস্থা—এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আব্বা প্রায়শই একটা কথা বলেন যেটা আমার কানে এখনো বাজে—
"দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষার কোনো শেষ নেই।"
এই একটি বাক্য আমাকে শিখিয়েছে যে শেখা কখনো থামে না, ব্যর্থতা কখনো শেষ স্টেশন নয়—সেটা একটা বাঁকমাত্র।
ফেল করা থেকে এ-প্লাস পাওয়ার গল্প
আমার জীবনের দুটি ঘটনা আমি কখনো ভুলব না—যে ঘটনা দুটো আব্বার বিশ্বাসের শক্তিকে প্রমাণ করে।
প্রথমবার, আমি উচ্চতর গণিতে ফেল করেছিলাম। পরীক্ষার ফলাফল হাতে পেয়ে আমার মাথায় বাজ পড়েছিল। প্রচণ্ড চিন্তায় ছিলাম—আব্বা কী বলবেন? মনে মনে হাজারটা বকুনি শোনার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু আব্বা বললেন—"সমস্যা নাই, ভালো করে আবার চেষ্টা করো। দেখবা ভালো করবা।" ব্যাস, এটুকুই। কোনো গালাগাল নেই, কোনো তিরস্কার নেই, কোনো তুলনা নেই অন্যের ছেলের সাথে। শুধু বিশ্বাস আর উৎসাহ। এরপর কী হলো জানেন? উচ্চতর গণিতে আর কখনোই এ-প্লাস মিস হয়নি। একবারও না।
দ্বিতীয়বার, একাদশ শ্রেণিতে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় ফেল করেছিলাম। সেবারও আব্বা একই কথা বললেন—"সমস্যা নেই, পরেরবার ভালো হবে।" আর সত্যিই, এরপর আর কখনোই এ-প্লাস মিস হয়নি। আব্বার এই অটল বিশ্বাস, এই নিঃশর্ত আস্থা—এটাই আমার সফলতার অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি কখনো আমাকে ভেঙে পড়তে দেননি, কখনো আমাকে আত্মবিশ্বাস হারাতে দেননি।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো—আমার আব্বা আমাকে নিয়ে যে পরিমাণ কনফিডেন্ট, আমি নিজেও নিজেকে নিয়ে ততটা কনফিডেন্ট নই। একজন বাবার এই অগাধ আস্থা সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার—এটা টাকা-পয়সা দিয়ে কেনা যায় না, চাকরি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।
বাংলা সাহিত্যের সাথে আমার পরিচয়—আব্বার হাত ধরে
আব্বার সাথে পড়ালেখা নিয়ে খুব কম কথাবার্তা হয় আমার। এটা শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে—একজন বাবা যিনি নিজে অধ্যাপক, তাঁর ছেলের সাথে পড়ালেখা নিয়ে আলোচনা কম হয়! আসলে আমাদের বেশিরভাগ সময়ের আলোচনার বিষয় বাংলা সাহিত্য। আব্বা নিজে বাংলার ছাত্র এবং এই বিষয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে আব্বার হাত ধরেই।
মোটাদাগে বলতে গেলে, খাটের উপর শুয়ে শুয়ে বাংলা শেখা হয়েছে আমার। কোনো কোচিং সেন্টারে নয়, কোনো টিউটরের কাছে নয়—বাড়ির খাটে, আব্বার পাশে শুয়ে শুয়ে বাংলা সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেছি আমি। মোটামুটি বাংলার পাঠ চুকিয়েছি শৈশবেই। রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয় সেখান থেকেই—সেই ছোটবেলা থেকে।
আব্বার প্রিয় "প্রফুল্ল" এবং অবিস্মরণীয় "যোগেশ"
আব্বার প্রিয় নাটক হলো গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখা "প্রফুল্ল" এবং সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র হলো "যোগেশ"। "প্রফুল্ল" বাংলা নাট্যসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি সামাজিক নাটক—উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক বাস্তবতা, দারিদ্র্য, ন্যায়-অন্যায়ের দ্বন্দ্ব, এবং মানবিক মূল্যবোধের সংকট নিয়ে রচিত এই নাটক আজও সমান প্রাসঙ্গিক। আর "যোগেশ" চরিত্রটি সত্যিই অবিস্মরণীয় ও অত্যন্ত শক্তিশালী—একজন মানুষ যিনি দায়িত্বের ভারে নুয়ে পড়েও মাথা উঁচু রাখেন, পরিবারের জন্য সবকিছু বিসর্জন দেন।
আসলে ব্যক্তিজীবনে এই যোগেশের সাথেই আব্বার খুব বেশি মিলে যায়। বাবা-মা, ভাইবোন, পরিবার, সংসার, বাড়ি—সবকিছুর দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা বহন করে চলেছেন তিনি, ঠিক যোগেশের মতোই। হয়তো সেই কারণেই যোগেশ আব্বার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র—কারণ সেই চরিত্রের মধ্যে তিনি নিজেকে খুঁজে পান।
রবীন্দ্রনাথ, "হৈমন্তী" এবং "পদ্মা নদীর মাঝি"
আব্বার প্রিয় লেখক রবীন্দ্রনাথ। আর রবীন্দ্রসামগ্রী যেহেতু বাড়িতে ছিল, সেহেতু অনেক অল্পবয়সে আমার রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয় হয়েছিল। সেই থেকে আমারও প্রিয়জন রবীন্দ্রনাথই—মাঝে আর কেউ জায়গা করে নিতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ—সবকিছুর মধ্যে একটি অসাধারণ মানবিকতা আছে, একটি গভীর দার্শনিকতা আছে যা আমাকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে।
আমি আমার আব্বার ছাত্র ছিলাম কলেজে। ওঁর মতো এতো সুন্দর করে খুব কম মানুষই বোধহয় "হৈমন্তী" উপস্থাপন করতে পারবে। রবীন্দ্রনাথের "হৈমন্তী"—বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী ছোটগল্প, যেখানে একজন নারীর আত্মমর্যাদা, সমাজের শ্বাসরোধকারী রীতিনীতি, এবং প্রেমের অসহায়ত্ব এক অসাধারণ শিল্পরূপে প্রকাশিত হয়েছে। আব্বা যখন ক্লাসে "হৈমন্তী" পড়াতেন, তখন পুরো ক্লাসরুম যেন রবীন্দ্রনাথের জগতে প্রবেশ করত। যদিও হৈমন্তীর সাথে আমার পরিচয় সেই ছোটবেলায়—বাড়ির সেই খাটে শুয়ে শুয়ে।
আব্বার প্রিয় উপন্যাস মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের "পদ্মা নদীর মাঝি"—বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি, যেখানে জেলে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা, প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা, এবং মানুষের টিকে থাকার লড়াই এক অবিস্মরণীয় আখ্যানে বর্ণিত হয়েছে। কুবের, কপিলা, হোসেন মিয়া—এই চরিত্রগুলো বাংলা সাহিত্যের চিরকালীন সম্পদ।
বিশ্ব রাজনীতি, দর্শন ও অন্তহীন বই পড়া
আব্বার সাথে শুধু সাহিত্য নিয়ে নয়, আরো আলোচনা হয় বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিই বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে—মধ্যপ্রাচ্যের সংকট থেকে শুরু করে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি থেকে ইউরোপের অর্থনৈতিক সংকট—কোনো বিষয়ই বাদ যায় না। দর্শনশাস্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে আমাদের ব্যাপক আলোচনা হয়—জীবনের অর্থ কী, মানুষের দায়িত্ব কী, সমাজের প্রতি আমাদের কর্তব্য কী—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা দুজনে যে কতটা সময় পার করেছি, তার হিসাব নেই।
আর অবসরে আব্বা যে পরিমাণ বই পড়েন, সেটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। বই পড়া আব্বার সবচেয়ে প্রিয় কাজ—আর সাথে নিয়মিত পত্রিকা পড়া। একজন মানুষ অবসর জীবনেও কীভাবে নিজেকে সমৃদ্ধ রাখতে পারেন, কীভাবে জ্ঞানের পিপাসা কখনো মেটাতে দেন না—আব্বা সেটার জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর এই অদম্য জ্ঞানপিপাসা আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে, শিখিয়েছে যে বয়স শুধু একটি সংখ্যা—শেখার কোনো শেষ নেই, কোনো বয়সসীমা নেই।
আব্বা—আমার চিরকালের গর্ব
আজ বিশ্ব বাবা দিবসে একটাই প্রার্থনা করি—আব্বা যেন একশো বছর বেঁচে থাকেন, সবসময় সুস্থ থাকেন। আব্বা, আমি তোমার মতো হতে চাই—মানুষের মতো মানুষ হতে চাই। তুমি যে মানদণ্ড তৈরি করে দিয়েছ, সেটাতে পৌঁছানো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
তোমাকে কখনোই ছাড়িয়ে যেতে পারব না—সেটা আমার পক্ষে অসম্ভব। তবে তোমার পরিচয়ে পরিচিত হতেও চাই, কারণ সেই পরিচয়টাই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমাকে কেউ যখন বলে—"আরে, তুমি প্রফেসর সাহেবের ছেলে!"—তখন গর্ব হয় আমার। গর্বে বুকটা ভরে যায়।
আমি এই গর্বটা নিয়ে সারাজীবন চলতে চাই। মানুষ যেন আমাকে দেখে বলে—"ছেলেটা বাপের মতো হইছে!"
আব্বা, তুমি আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছ—নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার শিক্ষা, ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর শিক্ষা, বাংলা সাহিত্যের সৌন্দর্য অনুভব করার শিক্ষা, বিশ্বকে বুঝতে শেখার শিক্ষা—এসব কোনো প্রতিষ্ঠান দিতে পারে না, কোনো পাঠ্যবই দিতে পারে না। এই শিক্ষাগুলো তোমার কাছ থেকে পেয়েছি, তোমার জীবন দেখে শিখেছি। তুমি একজন শিক্ষক শুধু ক্লাসরুমে নও—তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক।
তোমার অগাধ বিশ্বাস আমার বুকে একটি আত্মবিশ্বাসের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে, যেটা কোনোদিন নিভবে না। তুমি আমার আব্বা—আমার গর্ব, আমার শক্তি, আমার ভিত্তি।
আমার অন্যান্য লেখা পড়তে আগ্রহী?
জীবন, সমাজ, সাহিত্য ও মানবিক অনুভূতি নিয়ে আমার আরও আত্মদর্শনমূলক লেখা পড়ুন।
সকল ব্লগ পড়ুন
